ঢাকা ১০:৪৪ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ফের ‘স্বৈরাচারী চেনা ছকের’ পুনরাবৃত্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ: ১০:৩৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ জুলাই ২০২৫

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পিএসটিইউ) সাম্প্রতিক শিক্ষক নিয়োগ মেধাবিদের স্বপ্নে জল ঢেলে পুরানো সেই “দুর্নীতি কোটাকেই” প্রধান্য দিয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিভাগের নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেখানে মারাত্মক দুর্নীতি ও অযোগ্য প্রার্থী নিয়োগের অভিযোগ উঠে।

ইতিমধ্যেই কয়েকটি বিভাগে  ২০টিরও বেশি পদে লেকচারার থেকে শুরু করে সহকারী অধ্যাপক নিয়োগে, মেধা নয় বরং পরিচয়, প্রভাব ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেনই মুখ্য হয়ে উঠেছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু লোক চক্ষুর অন্তরালে থেকে গেছে বিভাগের নিয়োগ বোর্ডের ফলাফল।

অনুসন্ধানী রিপোর্টের ভিত্তিতে জানা যায়, এই বিভাগে ১ টি সহকারী অধ্যাপক পদের বিপরীতে ৩ জন প্রার্থীকে ইন্টার্ভিউ কার্ড প্রদান করা হয়। যার মধ্যে ড. মো. হাফিজুর রহমান এর প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি ইতোমধ্যেই অন্য একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩ বছর যাবত চাকুরী করছেন। তার অনার্স, মাস্টার্স, পিএইচডি ও ১ বছরের পোস্টডক অভিজ্ঞতাসহ ২৫ টি ঝঈও আর্টিকেল ও সম্পাদক (ঊফরঃড়ৎ) হিসাবে ১ টি বইও রয়েছে যার টোটাল জার্নাল ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর প্রায় ১০০ এবং সাইটেশান সংখ্যা প্রায় ৯২০।

দ্বিতীয় প্রার্থী ড. মো. সিরাজুল ইসলাম এর প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তিনি চায়নাতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং ২ বছরের পোস্টডক অভিজ্ঞতা । তার গবেষণা অভিজ্ঞতা অনেক ও গবেষণার বিষয়বস্তু খুবই মৌলিক। তার প্রকাশিত ২৩ টি ঝঈও আর্টিকেল এবং টোটাল জার্নাল ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর প্রায় ৪৪.৭৮৯ এবং সাইটেশান সংখ্যা প্রায় ৪০০ ও সম্পাদক হিসাবে ৩ টি বইও রয়েছে এবং পাশা পাশি তিনটি জার্নাল এর ঊফরঃড়ৎরধষ ইড়ধৎফ গবসনবৎং এছাড়াও দুটি গবেষণা অধিৎফং রয়েছে ।

কিন্তু, তৃতীয় প্রার্থী ড. মোঃ নাজমুস সাকিব এর প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তার অনার্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি থাকলেও কোন পোস্টডক অভিজ্ঞতা নেই। নেই কোন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরীর অভিজ্ঞতা এবং একাডেমিক ফলাফল দুটি প্রার্থীর তুলনায় কম। অথচ শোনা যাচ্ছে উক্ত ফ্যাকাল্টির প্রো-ভিসি, চেয়ারম্যান, ডীন, ও ভিসি মিলে নিয়োগ বোর্ডের এক্সপার্ট সদস্যদের সুপারিশকে তোয়াক্কা না করে নাজমুস সাকিবকেই নিয়োগের জন্য বাছাই করা হয়।

অথচ শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণা অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে স্বাভাবিক মার্কিংয়ে ড. মো. হাফিজুর রহমান প্রথম ও ড. মো. সিরাজুল ইসলাম দ্বিতীয় হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে বাদ দিয়ে তৃতীয় ড. মো. নাজমুস সাকিব কেই নিয়োগের জন্য বাছাই করা হয়েছে বলেই জানিয়েছেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোর্ডের একজন এক্সপার্ট মেম্বার। এখানে ইউজিসি কর্তৃক প্রণীত মৌলিক শিক্ষক নীতিমালার ব্যত্তয় ঘটেছে বলেও অনেকে মনে করেন যা পূর্ব পরিকল্পিত দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে।

এ বিষয়ে প্রার্থীদের কাছে জানতে চাইলে কিছুটা বিস্মিত হয়ে ড. মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “ভাইভার আগেই আমাকে নানাভাবে আর্থিক সুবিধা চেয়ে ইঙ্গিত দেয়া হয়। আমি স্পষ্ট করে অপারগতা জানালে পরে আমাকে বাদ দেয়া হয়।” তিনি বলেন, “আমি চেয়েছিলাম দেশকে কিছু দিতে, কিন্তু এখন নিজেকেই গুটিয়ে নিতে হচ্ছে। এভাবে কি দেশ ফিরে পাবে তার মেধা?” । তিনি আরও বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কে অনুরোধ করছি, এই বিষয়টি পর্যালোচনা করা উচিত এবং ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অপর প্রার্থী, ড. মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের তরুণ ছেলে মেয়েরা একটা বৈষম্য ও কোটাহীন মেধাবী রাষ্ট্র গঠনের জন্য মাত্র কয়েকদিন আগেই যেভাবে অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিল, সেটা কি আমরা ভুলে গেলাম! তাহলে যা শুনতে পাচ্ছি তাতে বলাই যায়, “এরকম বোর্ডের আয়োজনটার দরকার কি ছিল?”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. এসএম হেমায়েত জাহান সম্পর্কে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রী এয়ার মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরীর আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার ও নিয়োগে প্রভাব খাটিয়ে আসছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. কাজী রফিকুল আলম এবং প্রোভিসি ড. হেমায়েত জাহানকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রশাসনিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এক্সপার্ট কমিটির সুপারিশের তোয়াক্কা না করে ভিসি-প্রোভিসি ‘উপরের চাপে’ এবং ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন।”

গণআন্দোলনের পরেও বদলায়নি বাস্তবতা-একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে গড়ে উঠেছিল যে নতুন আশার তরঙ্গ—সেখানে শিক্ষা ও গবেষণা-ক্ষেত্রে এই ধরনের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নয়—নিয়োগ-ব্যবস্থার নৈতিকতার বদল জরুরি হয়ে পড়েছে এখন।

 

এম.কন্ঠ/  ০৫ জুলাই  /এম. টি

নিউজটি শেয়ার করুন

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে ফের ‘স্বৈরাচারী চেনা ছকের’ পুনরাবৃত্তি

প্রকাশ: ১০:৩৮:৩৩ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৫ জুলাই ২০২৫

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পিএসটিইউ) সাম্প্রতিক শিক্ষক নিয়োগ মেধাবিদের স্বপ্নে জল ঢেলে পুরানো সেই “দুর্নীতি কোটাকেই” প্রধান্য দিয়েছে।

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন বিভাগের নিয়োগ বোর্ড অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু সেখানে মারাত্মক দুর্নীতি ও অযোগ্য প্রার্থী নিয়োগের অভিযোগ উঠে।

ইতিমধ্যেই কয়েকটি বিভাগে  ২০টিরও বেশি পদে লেকচারার থেকে শুরু করে সহকারী অধ্যাপক নিয়োগে, মেধা নয় বরং পরিচয়, প্রভাব ও অনৈতিক আর্থিক লেনদেনই মুখ্য হয়ে উঠেছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু লোক চক্ষুর অন্তরালে থেকে গেছে বিভাগের নিয়োগ বোর্ডের ফলাফল।

অনুসন্ধানী রিপোর্টের ভিত্তিতে জানা যায়, এই বিভাগে ১ টি সহকারী অধ্যাপক পদের বিপরীতে ৩ জন প্রার্থীকে ইন্টার্ভিউ কার্ড প্রদান করা হয়। যার মধ্যে ড. মো. হাফিজুর রহমান এর প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তিনি ইতোমধ্যেই অন্য একটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩ বছর যাবত চাকুরী করছেন। তার অনার্স, মাস্টার্স, পিএইচডি ও ১ বছরের পোস্টডক অভিজ্ঞতাসহ ২৫ টি ঝঈও আর্টিকেল ও সম্পাদক (ঊফরঃড়ৎ) হিসাবে ১ টি বইও রয়েছে যার টোটাল জার্নাল ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর প্রায় ১০০ এবং সাইটেশান সংখ্যা প্রায় ৯২০।

দ্বিতীয় প্রার্থী ড. মো. সিরাজুল ইসলাম এর প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, তিনি চায়নাতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং ২ বছরের পোস্টডক অভিজ্ঞতা । তার গবেষণা অভিজ্ঞতা অনেক ও গবেষণার বিষয়বস্তু খুবই মৌলিক। তার প্রকাশিত ২৩ টি ঝঈও আর্টিকেল এবং টোটাল জার্নাল ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর প্রায় ৪৪.৭৮৯ এবং সাইটেশান সংখ্যা প্রায় ৪০০ ও সম্পাদক হিসাবে ৩ টি বইও রয়েছে এবং পাশা পাশি তিনটি জার্নাল এর ঊফরঃড়ৎরধষ ইড়ধৎফ গবসনবৎং এছাড়াও দুটি গবেষণা অধিৎফং রয়েছে ।

কিন্তু, তৃতীয় প্রার্থী ড. মোঃ নাজমুস সাকিব এর প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, তার অনার্স, মাস্টার্স ও পিএইচডি থাকলেও কোন পোস্টডক অভিজ্ঞতা নেই। নেই কোন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরীর অভিজ্ঞতা এবং একাডেমিক ফলাফল দুটি প্রার্থীর তুলনায় কম। অথচ শোনা যাচ্ছে উক্ত ফ্যাকাল্টির প্রো-ভিসি, চেয়ারম্যান, ডীন, ও ভিসি মিলে নিয়োগ বোর্ডের এক্সপার্ট সদস্যদের সুপারিশকে তোয়াক্কা না করে নাজমুস সাকিবকেই নিয়োগের জন্য বাছাই করা হয়।

অথচ শিক্ষাগত যোগ্যতা, গবেষণা অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে স্বাভাবিক মার্কিংয়ে ড. মো. হাফিজুর রহমান প্রথম ও ড. মো. সিরাজুল ইসলাম দ্বিতীয় হওয়া সত্ত্বেও তাদেরকে বাদ দিয়ে তৃতীয় ড. মো. নাজমুস সাকিব কেই নিয়োগের জন্য বাছাই করা হয়েছে বলেই জানিয়েছেন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বোর্ডের একজন এক্সপার্ট মেম্বার। এখানে ইউজিসি কর্তৃক প্রণীত মৌলিক শিক্ষক নীতিমালার ব্যত্তয় ঘটেছে বলেও অনেকে মনে করেন যা পূর্ব পরিকল্পিত দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে।

এ বিষয়ে প্রার্থীদের কাছে জানতে চাইলে কিছুটা বিস্মিত হয়ে ড. মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “ভাইভার আগেই আমাকে নানাভাবে আর্থিক সুবিধা চেয়ে ইঙ্গিত দেয়া হয়। আমি স্পষ্ট করে অপারগতা জানালে পরে আমাকে বাদ দেয়া হয়।” তিনি বলেন, “আমি চেয়েছিলাম দেশকে কিছু দিতে, কিন্তু এখন নিজেকেই গুটিয়ে নিতে হচ্ছে। এভাবে কি দেশ ফিরে পাবে তার মেধা?” । তিনি আরও বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কে অনুরোধ করছি, এই বিষয়টি পর্যালোচনা করা উচিত এবং ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অপর প্রার্থী, ড. মো. হাফিজুর রহমান বলেন, আমাদের তরুণ ছেলে মেয়েরা একটা বৈষম্য ও কোটাহীন মেধাবী রাষ্ট্র গঠনের জন্য মাত্র কয়েকদিন আগেই যেভাবে অকাতরে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিল, সেটা কি আমরা ভুলে গেলাম! তাহলে যা শুনতে পাচ্ছি তাতে বলাই যায়, “এরকম বোর্ডের আয়োজনটার দরকার কি ছিল?”

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. এসএম হেমায়েত জাহান সম্পর্কে অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রী এয়ার মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরীর আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার ও নিয়োগে প্রভাব খাটিয়ে আসছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. কাজী রফিকুল আলম এবং প্রোভিসি ড. হেমায়েত জাহানকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক প্রশাসনিক সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এক্সপার্ট কমিটির সুপারিশের তোয়াক্কা না করে ভিসি-প্রোভিসি ‘উপরের চাপে’ এবং ‘ব্যক্তিগত পছন্দ’ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেন।”

গণআন্দোলনের পরেও বদলায়নি বাস্তবতা-একুশ শতকের তৃতীয় দশকে এসে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পটভূমিতে গড়ে উঠেছিল যে নতুন আশার তরঙ্গ—সেখানে শিক্ষা ও গবেষণা-ক্ষেত্রে এই ধরনের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন তোলে। শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল নয়—নিয়োগ-ব্যবস্থার নৈতিকতার বদল জরুরি হয়ে পড়েছে এখন।

 

এম.কন্ঠ/  ০৫ জুলাই  /এম. টি