২৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করতে মাদক ব্যবসায়ীর ট্রাক ছিনতাইয়ের নাটক
টাঙ্গাইলে ২৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করতে ট্রাক ছিনতাইয়ের নাটক সাজানোর অভিযোগ উঠেছে কালিহাতী উপজেলা আওয়ামী লীগের দোষর কুখ্যাত মাদক ব্যবসায়ী এস এম মামুন অর রশিদের বিরুদ্ধে। এনিয়ে পুরো উপজেলা জুড়ে বইছে সমালোচনার ঝড়। অনুসন্ধানে এমন তথ্যই বেড়িয়ে এসেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত চলমান চার লেন সড়কে ৭৩ লাখ ৪০ হাজার টাকার মাটি ফেলার কাজ পান রিফাত এন্টার প্রাইজের মো. মোহন মিয়া। সেখান থেকে পরবর্তীতে তিনি এলেঙ্গার মো. মশিউর রহমানকে সাব ঠিকাদার হিসেবে ৪৩ লাখ টাকার মাটি ফেলার কাজ করার অনুমতি দেন।
এরপর মশিউর রহমান কাজ শেষ করার পর কোন প্রকার বিল না পাওয়ায় এ নিয়ে মোহনের সাথে তার দ্বন্দ সৃষ্টি হয়। পরে শালিশী বৈঠকের মাধ্যমে সাবেক এমপি আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর সমঝোতায় এস এম মামুন অর রশিদকে পাওয়ার করে দেন মুল ঠিকাদার মো. মোহন মিয়া।
এ নিয়ে ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নোটারী পাবলিকের মাধ্যমে একটি অঙ্গীকার নামা প্রদান করেন এস এম মামুন অর রশিদ। সেখানে মামুন উল্লেখ করেন, চার লেন প্রকল্পের মূল ঠিকাদার আব্দুল মোনেম লিঃ থেকে মাটি ফেলার জন্য রিফাত এন্টার প্রাইজকে যে ৭৩ লাখ টাকা বিল প্রদান করা হবে, সেখান থেকে আরেক সাব ঠিকাদার মশিউর রহমানকে (তার নির্ধারিত) কাজের ৪৩ লাখ টাকা নগদ বা চেকের মাধ্যমে পরিশোধ করতে বাধ্য থাকবো।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২ মার্চ কাজের একাংশের বিল বাবদ আব্দুল মোনেম লিঃ এর পক্ষ থেকে এস এম মামুন অর রশিদের কৃষি ব্যাংক কালিহাতী শাখার একাউন্ট নম্বরে (৫০২২-০২১০০০৩৬৪৪) ২০ লাখ, ২৭ মার্চ চার লাখ টাকা, ১৭ মে ১৫ হাজার ৫০০ টাকা, ৯ জুলাই এক লাখ, প্রদান পরিশোধ করা হয়। পরে ৬ মার্চ একই একান্ট থেকে অঙ্গীকারনামা মোতাবেক মশিউর রহমানকে কাজের একাংশের বিল বাবদ ১২ লাখ টাকা প্রদান করা হয়।
এর আগে এস এম মামুন অর রশিদ এবং মশিউর রহমান ঢাকায় আব্দুল মোনেম লিঃ এর কার্যালয়ে যান। সেখানে এস এম মামুন অর রশিদ নগদ ১০ লাখ টাকা বিল বাবদ গ্রহন করেন এবং মশিউর রহমানকে ৫ লাখ টাকা তার কাজের একাংশের বিল প্রদান করেন। এরই মধ্যে এস এম মামুনের স্ত্রী অসুস্থ্য থাকায় মশিউর রহমানের কাছ থেকে এক লাখ টাকা ধার নেন মামুন। আর এই টাকা ২০২৫ সালের ৯ জুলাই কৃষি ব্যাংক কাওরান বাজার কর্পোরেট শাখার মাধ্যমে মামুনের চলতি হিসাব নম্বরে প্রদান করা হয়।
একই বছর ৩ আগষ্ট পুনরায় কাজের আরেক অংশের বিল বাবদ আব্দুল মোনেম লিঃ এস এম মামুন অর রশিদের কৃষি ব্যাংক কালিহাতী শাখার (৫০২২-০২১০০০৩৬৪৪) একাউন্ট নম্বরে ৫ লাখ টাকা, ২৬ আগষ্ট দুই লাখ টাকা এবং ২৭ আগস্ট পুনরায় এস এম মামুন অর রশিদের একই একাউন্টে ২৩ লাখ টাকা প্রদান করে আব্দুল মোনেম লিঃ। চূড়ান্ত বিল পাওয়ার পর সাব ঠিকাদার মশিউর রহমানের বকেয়া ২৬ লাখ এবং ধার দেওয়া এক লাখ টাকা পরিশোধ করতে বিভিন্ন ভাবে টালবাহা শুরু করেন এস এম মামুন অর রশিদ।
এক পর্যায়ে মশিউর রহমান ক্ষিপ্ত হয়ে পাওনা টাকা আদায়ের জন্য এস এম মামুনের দুইটি ড্রাম ট্রাক এলেঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে আটক করেন এবং পাওনা ২৭ লাখ টাকা দিয়ে ট্রাক দুটি নিয়ে যেতে বলেন। এতেও কোন সারা না পাওয়ায় মশিউর ট্রাক দুটি কালিতাহী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে এস এম মামুন অর রশিদকে ট্রাক দুটির বৈধ কাগজপত্র দেখিয়ে ট্রাক দুটি নিয়ে যাওয়ার জন্য বললে তিনি বৈধ কোন কাজগপত্র দেখাতে পারেননি। এ কারণে ট্রাক দুটি জব্দ দেখানো হয়। পরে কাজ বাবদ মশিউর রহমানের পাওনা ২৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ এর জন্য ট্রাক দুটি ছিনতাই হয়েছে বলে টাঙ্গাইল আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন এস এম মামুন অর রশিদ। এতে তিনি উলেখ করেন, মশিউর রহমান দুটি ড্রাম ট্রাক ছিনতাই করে তার (মামুন) কাছে ৪৪ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন।

কে এই এস এম মামুন :
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সাতুটিয়া গ্রামের কুখ্যাত মাদক সম্রাট এস এম মামুন অর রশিদ। তার মাদক ব্যবসায় কেউ বাধা দিতে গেলেই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা, গুমকি এবং বিভিন্ন স্থানে নামে বেনামে অভিযোগ দিয়ে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
কালিহাতী উপজেলার সাতুটিয়া গ্রামের (বল্লা রোড) মো. আব্দুল হামিদের ছেল এস এম মামুন অর রশিদ দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে পুরো কালিহাতী উপজেলার কয়েকজন মাদক ব্যবসায়ীদের দিয়ে মাদক সেবীদের কাছে চাহিদামত পৌছে দিচ্ছেন। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত ১০/১২টি মাদক এবং একটি নারী নির্যাতন ও অপরহরন মামলা রয়েছে। ইতিপূর্বে পাঁচ বার গ্রেপ্তারও হয়েছেন তিনি। পরবর্তীতে জামিনে বের হয়ে তৎকালীন মন্ত্রী আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর সাথে সখ্যতা গড়ে তুলেন। পরে তিনি পুরোপুরি আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পরেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে এস এম মামুন তার মাদক ব্যবসা বাড়াতে থাকেন।
কালিহাতী উপজেলা ছাড়াও তার মাদক ব্যবসা ঘাটাইল, হামিদপুর, ভূঞাপুর, সখীপুর, মধুপুর, ও টাঙ্গাইল শহরেও ছড়িয়ে পরে। গত ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পর কিছুদিন গা-ঢাকা দেন তিনি। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর আবার তিনি এলাকায় ফেরেন এবং মাদক ব্যবসা পুনরায় শুরু করেছেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত থাকায় এবং নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় এস এম মামুন অর রশিদকে কয়েকবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী থানা পুলিশ প্রথম তাকে গ্রেপ্তার করে। এর পর তিনি জামিতে বের হন। ২০১৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কালিহাতী থানা পুলিশের হাতে মাদকসহ গ্রেপ্তার হন। জামিনে বের হয়ে পুনরায় মাদক ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালর ২৭ এপ্রিল কুড়িগ্রাম থানা পুলিশ মাদকসহ গ্রেপ্তার করে মামুনকে। এরপর তিনি আবার জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে থেকে তার মাদক ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকেন। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হলে ২০২১ সালের ২৬ জুন কালিহাতী থানা পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয় মামুন। আবার তিনি জামিনে বের হয়ে আসেন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে থেকে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মো. আদিবুল ইসলাম (পিপিএম-সেবা) জানান, এস এম মামুন অর রশীদের বিরুদ্ধে খোঁজ খবর নেওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এম.কন্ঠ/ ১৬ জুন /এম. টি
























