ঘাটাইলে অন্ধত্বকে জয় করা খামারি গফুর এখন সমাজের আলোকবর্তিকা
শারীরিক অন্ধত্ব বা অন্তরের অজ্ঞতা ও কুসংস্কার রুখতে মানুষের কর্মতৎপরতা, সততা ও সদ্বিচার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। কর্মনিষ্ঠ জীবন মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করে এবং সমাজ থেকে সব ধরনের অন্ধত্ব ও অনৈতিকতা প্রতিরোধে আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করে।
ঘাটাইলের শিশিরচালা গ্রামের ৩২ বছর বয়সী আব্দুল গফুর নামের এক যুবক অন্ধত্বকে জয় করে পরিবারের আলোকবর্তিকা হিসেবে কাজ করছেন। অন্ধত্ব রুখতে পারেনি তার সংসারের কাজ করার অবদান। অন্ধত্বকে হারিয়ে দেওয়া আব্দুল গফুর এখন পরিবারের বড় সম্পদ।
আব্দুল গফুর জন্মের পর স্বাভাবিক জীবন যাপন করলেও ৯ বছর বয়সে হঠাৎ টাইফয়েড জ¦রে আক্রান্ত হয়ে দু’চোখে দৃষ্টি হারালেও পরিবারের বোঝা হতে না চাওয়া আব্দুল গফুরের উপার্জনে চলে সংসার। সংসারের আলোকবর্তিকা আব্দুল গফুর এখন সমাজের কাছে আইডল।
অন্ধত্ব মানুষকে ক্রীতদাস বানায়। মানুষের নিজের চিন্তাশক্তিকে কেড়ে নেয়। কিন্তু অন্ধ আব্দুল গফুর মানুষের ক্রীতদাস বা অন্যের আলোয় পথ চলার পাত্র নয়। তাইতো টাইফয়েড জ¦রে অন্ধ হয়ে যাওয়া আব্দুল গফুর পারিবারিক অসচ্ছলতার কারণে চিকিৎসার অভাবে সুস্থ হতে পারেনি। তবে অন্ধত্বকে প্রতিবন্ধকতা মনে করে থেমে যাননি। সংসারে হাল ধরতে কৃষিকাজসহ যুক্ত হয়েছেন নানা কাজে।

২০১৫ সালে প্রাণী সম্পদ চিকিৎসক মোস্তাফিজুর রহমানের পরামর্শে মুরগির খামার করেন অন্ধ আব্দুল গফুর। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়ে মুরগির খামারে প্রচুর সময় দিতে থাকেন। মুরগিকে ঠিকমত খাবার দেওয়া থেকে শুরু করে ডিম তোলা সবই করেন নিজে হাতেই। পাশাপাশি নিখুঁতভাবে করেন কৃষিকাজও। প্রতিনিয়ত মুরগির খোঁজখবর ও যতœ নেওয়ার কারনে লেয়ার মুরগির খামার থেকে সফলতা আসে। লেয়ার মুরগির খামারি অন্ধ আব্দুল গফর এখন সবার অনুকরনীয় আলোকবর্তিকা।
প্রাণী সম্পদ চিকিৎসক মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ২০১৫ সালে অন্ধ আব্দুল গফুরের কাজ করার গভীরতা দেখে তাকে লেয়ার মুরগির খামারের কথা বলেছিলাম। সে অন্ধ হলেও তার স্মৃতি শক্তি ও প্রখর বুদ্ধিজ্ঞান। সে সহজেই মুরগির গায়ে হাত দিয়ে এবং মুরগির পায়খানা শুখে বলে দিতে পারতো, মুরগি কোন রোগে আক্রান্ত। আব্দুল গফুরের একনিষ্ঠ কাজ করার ক্ষমতা তাকে এতদূর নিয়ে এসেছে।
ঘাটাইল উপজেলার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডাঃ মো. বাহাউদ্দিন সারোয়ার রিজভী জানান, দশ বছর আগে অন্ধ আব্দুল গফুরের কথা শুনে তাকে খামার করার পরামর্শ ও সহযোগিতা করেন তৎকালীন উপজেলা প্রানী সম্পদ কর্মকর্তা। অনেক খামারি ঝরে গেলেও সফলতার অনন্য দৃষ্টান্তস্থাপন করায় খুশি তিনি।
অন্ধ আব্দুল গফুরের নিকট থেকে জানা যায়, ছোটকাল থেকে আব্দুল গফুর তার বাবা কৃষক মোঃ আবেদ আলীর সাথে কৃষিকাজে সহযোগিতা করতেন। ৯ বছর বয়সে অন্ধ হলেও তিনি বাবার সাথে কৃষিকাজ ছাড়া বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতেন। ২০১৫ সালে প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শে লেয়ার মুরগির কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তার খামারে ২৪০০ লেয়ার মুরগি আছে। তিনি ছোটকাল থেকে অন্ধত্বকে জয় করে মনের চোখ দিয়ে খুব হিসেব করে পথ চলেন। প্রতি পদক্ষেপে পা ফেলেন আর বোঝার চেষ্টা করেন তিনি কি অবস্থায় আছেন এবং কি করছেন? মুরগির যদি কোন অসুখ হয় তাহলে মুরগির শরীর হাত দিয়ে তিনি বুঝতে পারেন মুরগি কোন রোগে আক্রান্ত! তিনি মহান আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া জানান, আল্লাহ তাকে প্রখর স্মৃতিশক্তি ও জ্ঞান দিয়েছেন। এই শক্তিই তার কাজ করার প্রেরণা।
তিনি দুনিয়ার বিচিত্ররুপ দেখতে না পারলেও তিনি ও তার বাবা মিলে সংসারে কাজ করে বড় ভাই মাসুদকে মেডিকেল এ্যাসিটেন্ট এবং ছোটভাই আরিফকে বিদেশ পাঠিয়েছেন। আর বোনকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়েছেন।
তিনি পাশের গ্রামের সুমাইয়া নামে একটি মেয়েকে বিয়ে করেছেন। গৃহিনী সুমাইয়া তার কাজে সর্বক্ষন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
অন্ধ আব্দুল গফুর ২০২৫ সালে কৃষি ক্ষেত্রে সাফল্যর জন্য স্ট্যার্ন্ডাড চাটার্ড চ্যানেল আই অ্যাগ্রো অ্যাওয়ার্ড সম্মাননা স্বারক এবং সাথে ৫ লক্ষ টাকা পুরস্কার অর্জন করেন।
এম.কন্ঠ/ ০৬ সেপ্টেম্বর /এম. টি


























