ঢাকা ০৩:০৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬, ৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
টাঙ্গাইলে আ’লীগের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বিএনপির বিক্ষোভ মিছিল গোপালপুরে ২৬ বছর সড়কের পাশে মানবেতর জীবন, খোঁজ নেয়নি শিক্ষিকা মেয়ে সখীপুরে নিখোঁজের দুই দিন পর পুকুরে মিলল শিশুর মরদেহ কালিহাতীতে বাস-সিএনজির সংঘর্ষে নারী নিহত টাঙ্গাইলে স্বেচ্ছাসেবকদলের বিক্ষোভ মিছিল টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঝটিকা মিছিল সাবেক কাউন্সিলর তানাকা’র ৫ম শাহাদাৎ বার্ষিকী পালিত বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে মানুষের বাক স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিলেন জিয়াউর রহমান-টুকু টাঙ্গাইলে নিউ রওশন টকিজের উদ্বোধন প্রভাবশালী ব্যক্তির হাত থেকে জবরদখলকৃত ভূমি উদ্ধারে সংবাদ সম্মেলন

গোপালপুরে ২৬ বছর সড়কের পাশে মানবেতর জীবন, খোঁজ নেয়নি শিক্ষিকা মেয়ে

মো. সেলিম হোসেন :
প্রকাশ: ০৮:২৬:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সাধারণত সন্তান-স্বজনের সান্নিধ্য ও যত্ন প্রত্যাশা করেন। কিন্তু টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের শাখারিয়া এলাকার মুজিবর খাঁর (৭৫) জীবনের গল্প যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে সড়কের পাশে একটি জরাজীর্ণ টিনের ছাপড়াঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। বার্ধক্য, অসুস্থতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই বৃদ্ধের পাশে নেই স্ত্রী-সন্তান কিংবা নিকটাত্মীয় কেউ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ সালে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন মুজিবর খাঁ। চাকরি করে মোটামুটি স্বচ্ছলভাবেই চলছিল তার সংসার। কিন্তু ১৯৯৮ সালে কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে বদলে যায় তার জীবনের সব হিসাব-নিকাশ। দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে একপর্যায়ে বিক্রি করতে হয় বসতভিটা, ঘরবাড়িসহ সহায়-সম্বল। কর্মক্ষমতা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি।

অসহায় অবস্থায় আশ্রয়ের খোঁজে তিনি চলে আসেন তারাকান্দি-ভূঞাপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে শাখারিয়া এলাকায়। সেখানেই রাস্তার ধারে ছোট্ট একটি টিনের ছাপড়াঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করেন। সেই আশ্রয়েই কেটে গেছে তার জীবনের ২৬ বছর।


মুজিবর খাঁর ব্যক্তিজীবনও সুখকর ছিল না। প্রথম স্ত্রী মিনুকে তালাক দেওয়ার পর সালমা নামে আরেক নারীকে বিয়ে করেন। তবে দ্বিতীয় স্ত্রীও পরবর্তীতে তাকে ছেড়ে অন্যত্র সংসার পাতেন। দুই সংসারে তার দুই মেয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে মালা নামে এক মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এবং অপর মেয়ে সীমা ময়মনসিংহে স্বামীর সঙ্গে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চাকরি করেন। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে বাবার দেখভাল কিংবা খোঁজখবর কেউই নেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

প্রতিবেশীরা জানান, বয়সের ভারে ন্যুব্জ মুজিবর খাঁ ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় অনেক আগেই হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা। দিনভর তিনি অপেক্ষা করেন কেউ খাবার এনে দেবে কি না। স্থানীয় সহৃদয় ব্যক্তিরা খাবার দিলে খেতে পারেন, না হলে অনাহারেই কাটাতে হয় দিন। অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থাও সহজে জোটে না।

শাখারিয়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাকে এ অবস্থায় দেখে আসছি। স্ত্রী-সন্তান কেউ তার পাশে নেই। এলাকার মানুষ যে যেভাবে পারে সাহায্য করার চেষ্টা করে। কিন্তু একজন বৃদ্ধ মানুষের জন্য এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তার জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুজিবর খাঁ বর্তমানে বয়স্ক ভাতা পান। তবে তার বাসস্থান, চিকিৎসা ও সার্বিক জীবনযাপনের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. এখলাস উদ্দিন বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তিনি বয়স্ক ভাতাভোগী। তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।”

একসময় পরিবার ও কর্মজীবনের স্বপ্ন নিয়ে পথচলা মুজিবর খাঁ এখন সময়ের নির্মম বাস্তবতার এক জীবন্ত সাক্ষী। সড়কের ধারে ছোট্ট একটি টিনের ছাপড়ায় কাটছে তার জীবনের শেষ অধ্যায়। প্রতিদিনের মতো আজও তিনি অপেক্ষা করেন, হয়তো কেউ একমুঠো খাবার নিয়ে আসবে, হয়তো কোনো সহৃদয় মানুষ তার পাশে দাঁড়াবে।

এম.কন্ঠ/ ২২ জুন /এম. টি

ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করুন

গোপালপুরে ২৬ বছর সড়কের পাশে মানবেতর জীবন, খোঁজ নেয়নি শিক্ষিকা মেয়ে

প্রকাশ: ০৮:২৬:১১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ সাধারণত সন্তান-স্বজনের সান্নিধ্য ও যত্ন প্রত্যাশা করেন। কিন্তু টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের শাখারিয়া এলাকার মুজিবর খাঁর (৭৫) জীবনের গল্প যেন তার সম্পূর্ণ বিপরীত। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে সড়কের পাশে একটি জরাজীর্ণ টিনের ছাপড়াঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। বার্ধক্য, অসুস্থতা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই বৃদ্ধের পাশে নেই স্ত্রী-সন্তান কিংবা নিকটাত্মীয় কেউ।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮২ সালে ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন মুজিবর খাঁ। চাকরি করে মোটামুটি স্বচ্ছলভাবেই চলছিল তার সংসার। কিন্তু ১৯৯৮ সালে কর্মরত অবস্থায় হঠাৎ স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে বদলে যায় তার জীবনের সব হিসাব-নিকাশ। দীর্ঘ চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে একপর্যায়ে বিক্রি করতে হয় বসতভিটা, ঘরবাড়িসহ সহায়-সম্বল। কর্মক্ষমতা হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তিনি।

অসহায় অবস্থায় আশ্রয়ের খোঁজে তিনি চলে আসেন তারাকান্দি-ভূঞাপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে শাখারিয়া এলাকায়। সেখানেই রাস্তার ধারে ছোট্ট একটি টিনের ছাপড়াঘর তৈরি করে বসবাস শুরু করেন। সেই আশ্রয়েই কেটে গেছে তার জীবনের ২৬ বছর।


মুজিবর খাঁর ব্যক্তিজীবনও সুখকর ছিল না। প্রথম স্ত্রী মিনুকে তালাক দেওয়ার পর সালমা নামে আরেক নারীকে বিয়ে করেন। তবে দ্বিতীয় স্ত্রীও পরবর্তীতে তাকে ছেড়ে অন্যত্র সংসার পাতেন। দুই সংসারে তার দুই মেয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে মালা নামে এক মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা এবং অপর মেয়ে সীমা ময়মনসিংহে স্বামীর সঙ্গে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চাকরি করেন। কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে বাবার দেখভাল কিংবা খোঁজখবর কেউই নেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

প্রতিবেশীরা জানান, বয়সের ভারে ন্যুব্জ মুজিবর খাঁ ঠিকমতো চলাফেরা করতে পারেন না। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ায় অনেক আগেই হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা। দিনভর তিনি অপেক্ষা করেন কেউ খাবার এনে দেবে কি না। স্থানীয় সহৃদয় ব্যক্তিরা খাবার দিলে খেতে পারেন, না হলে অনাহারেই কাটাতে হয় দিন। অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থাও সহজে জোটে না।

শাখারিয়া এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে তাকে এ অবস্থায় দেখে আসছি। স্ত্রী-সন্তান কেউ তার পাশে নেই। এলাকার মানুষ যে যেভাবে পারে সাহায্য করার চেষ্টা করে। কিন্তু একজন বৃদ্ধ মানুষের জন্য এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তার জন্য সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।”

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুজিবর খাঁ বর্তমানে বয়স্ক ভাতা পান। তবে তার বাসস্থান, চিকিৎসা ও সার্বিক জীবনযাপনের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. এখলাস উদ্দিন বলেন, “বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। তিনি বয়স্ক ভাতাভোগী। তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।”

একসময় পরিবার ও কর্মজীবনের স্বপ্ন নিয়ে পথচলা মুজিবর খাঁ এখন সময়ের নির্মম বাস্তবতার এক জীবন্ত সাক্ষী। সড়কের ধারে ছোট্ট একটি টিনের ছাপড়ায় কাটছে তার জীবনের শেষ অধ্যায়। প্রতিদিনের মতো আজও তিনি অপেক্ষা করেন, হয়তো কেউ একমুঠো খাবার নিয়ে আসবে, হয়তো কোনো সহৃদয় মানুষ তার পাশে দাঁড়াবে।

এম.কন্ঠ/ ২২ জুন /এম. টি