গোপালপুরে এক ছাদের নিচে ৫০ জন-ঐক্য-ঐতিহ্যের অনন্য উদাহরণ
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার হাদিরা ইউনিয়নের ভাদুরীর চর এলাকায় অবস্থিত ‘সরকার বাড়ি’। একই ছাদের নিচে বসবাস, পারিবারিক বন্ধন, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিকতার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য পরিবার। সাত ভাই ও এক বোনের এই বৃহৎ পরিবার আজও একসঙ্গে বসবাস করে বিরল এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, যা স্থানীয়ভাবে প্রশংসা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পিতা-মাতার মৃত্যুর পরও ভাই-বোনদের মধ্যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও দায়িত্ববোধ এতটাই অটুট যে আলাদা হওয়ার চিন্তাও তাদের মনে আসেনি। বরং সময়ের সঙ্গে এই বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে। পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয় পারস্পরিক আলোচনা ও সম্মিলিত মতামতের ভিত্তিতে।
এই পরিবারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাদের যৌথ জীবনযাপন। প্রতিদিনের বাজার, রান্না থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব কার্যক্রম পরিচালিত হয় সম্মিলিতভাবে। প্রায় ৫০ জন সদস্য ও অতিথির জন্য প্রতিদিন একসঙ্গে রান্না করা হয় এবং সবাই মিলে একত্রে খাবার খান—যা বর্তমান ব্যস্ত ও এককেন্দ্রিক জীবনের প্রেক্ষাপটে বিরল চিত্র।
ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রেও তাদের ঐক্য স্পষ্ট। কয়েক বছর আগে পরিবারের ১১ জন সদস্য একসঙ্গে পবিত্র ওমরাহ পালন করেন। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবে তারা একই রঙের পোশাক পরেন, যা পারস্পরিক ভালোবাসা ও একাত্মতার প্রতীক হিসেবে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
পরিবারের সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন—মো. জাকির হোসেন, মো. ইসমাইল হোসেন, মো. আসাদুজ্জামান, মো. রফিকুল ইসলাম, ডা. আব্দুর রশিদ, একমাত্র বোন হাসনা বেগম, ডা. এস. এম. হায়দার আলী এবং সর্বকনিষ্ঠ এস. এম. আল হেলাল। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ পেশায় প্রতিষ্ঠিত এবং সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছেন।
পিতা-মাতার স্মৃতি ধরে রাখতে এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য তারা প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘জমিলা হাকিম কল্যাণ ট্রাস্ট’ ও ‘সুখী পল্লীমা সোসাইটি’। সরকারি অনুমোদনপ্রাপ্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তাঁরা। ‘জমিলা হাকিম কল্যাণ ট্রাস্ট’-এর উদ্যোগে প্রতিবছর ওয়াজ মাহফিল আয়োজন করা হয়। অন্যদিকে ‘সুখী পল্লীমা সোসাইটি’ সারা বছর মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডেও পরিবারটি অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। এলাকার উন্নয়ন, ধর্মীয় আয়োজন এবং অসহায় মানুষের সহায়তায় তারা সক্রিয় থাকায় স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সম্মান অর্জন করেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, “বর্তমান সময়ে যেখানে সামান্য বিষয় নিয়েও পরিবারে ভাঙন দেখা যায়, সেখানে সরকার বাড়ির এই ঐক্য সত্যিই অনুকরণীয়। তাদের ভালোবাসা ও সহমর্মিতা সমাজের জন্য বড় শিক্ষা।”
জানা যায়, ভাদুরীর চর এলাকায় এক পূর্বপুরুষ মো. নজরুল ইসলাম সরকার বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে এই পরিবার। তাঁর বংশধর আব্দুল হাকিমের ঘরেই জন্ম নেয় বর্তমান প্রজন্মের সাত ভাই ও এক বোন, যারা আজ ঐক্য ও পারিবারিক বন্ধনের উজ্জ্বল উদাহরণ।
সরকার বাড়ির এই সম্মিলিত জীবনযাপন কেবল একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি একটি আদর্শ সমাজ গঠনের বাস্তব উদাহরণ। যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সহযোগিতাই একটি দৃঢ় পরিবারের ভিত্তি—তারই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এই পরিবার।
এম.কন্ঠ/ ৩০ মার্চ/এম. টি



















