ঢাকা ০৮:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬, ১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রামরু’র সহযোগিতায় সাড়ে ৭৪ লাখ টাকা পেলেন প্রবাসীর স্ত্রী শুকুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ: ০১:২৩:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

টাঙ্গাইলের কালিহাতীর নাগবাড়ীর পাকুটিয়া গ্রামের খলিল মিয়া পরিবারের হাল ধরতে ও সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে ১৭ বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। চার বছর পর ছুটিতে বাড়ি এসে আবার তিনি সৌদি আরব যান।

২০১৫ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে খবর আসে সৌদি আরবে খলিল মিয়া সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। পরে পরিবারের সদস্য ও সংসার চালানো নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন শুকুরী জান।

অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু’র) সহযোগিতা ১১ বছর পর ৭৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা পান নিহত খলিল মিয়ার স্ত্রী শুকুরী জান।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে খলিল মিয়া ২০০৯ সালে সৌদি আরব গমন করেন। পরিবারের অভাব-অনটন দূর করা, সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমায় খলিল মিয়া। স্বামীর স্বপ্ন পূরণে তার স্ত্রী শুকুরী জান অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করে সংসার সামলাতে থাকেন। অল্প আয় এবং ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর কেটে যায়। ঋণ পরিশোধের আগেই মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব এসে পড়ে। আবারও ঋণ করে মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেন। এদিকে ছেলে স্কুলে ভর্তি হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে একটি সাধারণ দোচালা ঘরও নির্মাণ করতে হয় ঋণ নিয়ে।

আরও জানা যায়, চার বছর পর খলিল মিয়া ছুটিতে দেশে আসেন। নতুন করে স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়ে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে আনন্দ ঘন সময় কাটিয়ে আবার ফিরে যান সৌদি আরবে। ২০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি হঠাৎ সৌদি আরব থেকে খবর আসে যে খলিল মিয়া সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এই সংবাদে শুকুরী জানের জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। খলিল মিয়ার মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেন। কেউ কেউ বলেন, বিদেশেই দাফন হলে ভালো হবে। কিন্তু এসব ভুল ধারণার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন নাগবাড়ী ইউনিয়নের ১ নম্বর সংরক্ষিত মহিলা আসনের ইউপি সদস্য রমেশা বেগম।

তিনি রামরুর বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, কোনো প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে রামরু মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করতে সহায়তা করে এবং সরকার থেকে প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করে। তিনি এসব বিষয় মৃত খলিল মিয়ার স্ত্রী শুকুরী জানকে অবহিত করেন।

পরবর্তীতে রামরুর সহযোগিতায় মরদেহ দেশে আনার জন্য আবেদন করা হয়। চার বার আবেদন ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৭ সালে খলিল মিয়ার মরদেহ দেশে আনা হয়। এক পর্যায়ে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার কারণে পরিবারটি আশা হারিয়ে ফেললেও রামরু তাদের পাশে থেকে নতুন করে সাহস জোগান। রামরু’র পক্ষে থেকে ডিবিসি টেলিভিশনের ‘অভিবাসীর আদালত’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করান এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন। অবশেষে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩ লক্ষ টাকা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডএ থেকে পায়, দুর্ঘটনা সংক্রান্ত আবেদন গৃহীত ও প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ওয়েজ আর্নার্স এর সাথে নিয়মিত ফলোআপ চলে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে খলিল মিয়ার পরিবার দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের বাবদ ৭৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা পান। দীর্ঘ সংগ্রাম, ধৈর্য্য এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে একটি অসহায় পরিবার ন্যায্য অধিকার ফিরে পেয়েছে। এটি ছিল জীবনসংগ্রাম এবং মানবিক সহায়তার এক অনন্য উদাহরণ। শুকুরী জান রামরু’র প্রতি চিরকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

এম.কন্ঠ/ ২৫ জুন /এম. টি

নিউজটি শেয়ার করুন

রামরু’র সহযোগিতায় সাড়ে ৭৪ লাখ টাকা পেলেন প্রবাসীর স্ত্রী শুকুরী

প্রকাশ: ০১:২৩:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

টাঙ্গাইলের কালিহাতীর নাগবাড়ীর পাকুটিয়া গ্রামের খলিল মিয়া পরিবারের হাল ধরতে ও সদস্যদের মুখে হাসি ফোটাতে ১৭ বছর আগে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। চার বছর পর ছুটিতে বাড়ি এসে আবার তিনি সৌদি আরব যান।

২০১৫ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে খবর আসে সৌদি আরবে খলিল মিয়া সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছেন। পরে পরিবারের সদস্য ও সংসার চালানো নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন শুকুরী জান।

অভিবাসন খাতের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু’র) সহযোগিতা ১১ বছর পর ৭৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা পান নিহত খলিল মিয়ার স্ত্রী শুকুরী জান।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে খলিল মিয়া ২০০৯ সালে সৌদি আরব গমন করেন। পরিবারের অভাব-অনটন দূর করা, সন্তানদের লেখাপড়া শিখিয়ে সুশিক্ষিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন নিয়েই বিদেশে পাড়ি জমায় খলিল মিয়া। স্বামীর স্বপ্ন পূরণে তার স্ত্রী শুকুরী জান অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করে সংসার সামলাতে থাকেন। অল্প আয় এবং ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বছরের পর বছর কেটে যায়। ঋণ পরিশোধের আগেই মেয়ের বিয়ের দায়িত্ব এসে পড়ে। আবারও ঋণ করে মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন করেন। এদিকে ছেলে স্কুলে ভর্তি হয়। মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে একটি সাধারণ দোচালা ঘরও নির্মাণ করতে হয় ঋণ নিয়ে।

আরও জানা যায়, চার বছর পর খলিল মিয়া ছুটিতে দেশে আসেন। নতুন করে স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়ে স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে আনন্দ ঘন সময় কাটিয়ে আবার ফিরে যান সৌদি আরবে। ২০১৫ সালের ১৯ জানুয়ারি হঠাৎ সৌদি আরব থেকে খবর আসে যে খলিল মিয়া সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। এই সংবাদে শুকুরী জানের জীবনে নেমে আসে গভীর অন্ধকার। খলিল মিয়ার মরদেহ দেশে আনার বিষয়ে অনেকেই নিরুৎসাহিত করেন। কেউ কেউ বলেন, বিদেশেই দাফন হলে ভালো হবে। কিন্তু এসব ভুল ধারণার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেন নাগবাড়ী ইউনিয়নের ১ নম্বর সংরক্ষিত মহিলা আসনের ইউপি সদস্য রমেশা বেগম।

তিনি রামরুর বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রমে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন যে, কোনো প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে রামরু মরদেহ দেশে আনার ব্যবস্থা করতে সহায়তা করে এবং সরকার থেকে প্রাপ্য আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করে। তিনি এসব বিষয় মৃত খলিল মিয়ার স্ত্রী শুকুরী জানকে অবহিত করেন।

পরবর্তীতে রামরুর সহযোগিতায় মরদেহ দেশে আনার জন্য আবেদন করা হয়। চার বার আবেদন ও দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০১৭ সালে খলিল মিয়ার মরদেহ দেশে আনা হয়। এক পর্যায়ে দীর্ঘসূত্রতা ও জটিলতার কারণে পরিবারটি আশা হারিয়ে ফেললেও রামরু তাদের পাশে থেকে নতুন করে সাহস জোগান। রামরু’র পক্ষে থেকে ডিবিসি টেলিভিশনের ‘অভিবাসীর আদালত’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করান এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনেন। অবশেষে ২০১৯ সালের জুলাই মাসে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩ লক্ষ টাকা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডএ থেকে পায়, দুর্ঘটনা সংক্রান্ত আবেদন গৃহীত ও প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং ওয়েজ আর্নার্স এর সাথে নিয়মিত ফলোআপ চলে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে খলিল মিয়ার পরিবার দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণের বাবদ ৭৪ লাখ ৫১ হাজার টাকা পান। দীর্ঘ সংগ্রাম, ধৈর্য্য এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে একটি অসহায় পরিবার ন্যায্য অধিকার ফিরে পেয়েছে। এটি ছিল জীবনসংগ্রাম এবং মানবিক সহায়তার এক অনন্য উদাহরণ। শুকুরী জান রামরু’র প্রতি চিরকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

 

এম.কন্ঠ/ ২৫ জুন /এম. টি