৩০ বছর ধরে শিকলে বাঁধা অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত সাইফুল
অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত সাইফুল ইসলাম র্দীঘ ৩০ বছর ধরে একটি ঘরে লোহার শিকলে বাঁধা পড়ে আছে। অনেকের ধারনা ব্রেন সমস্যায় জর্জরিত সাইফুলের নেই সুস্থতার কোন লক্ষণ। ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত সাইফুলের মা রহিমা বেগম স্বামীসহ জমিজমা হারিয়ে পথে ঘাটে ভিক্ষা করে জীবনযাপন করছেন।
টিনের ঘরের বাড়ান্দায় সিমেন্টে খুটির সাথে লম্বা শিকলে যুক্ত সাইফুলের পা। যা সর্বক্ষন তালা দেওয়া। ঘরে ফ্লোরে বেতের পাটিপাতা। এখানেই সাইফুল মন চাইলে ঘুমিয়ে যায়। নয়তো বড় বড় চোখ মেলে অন্ধকারে চেয়ে থাকা। যদিও দিনের বেলা পায়ে শিকল বান্দা অবস্থায় বাড়ির আশেপাশের পরিচিত মানুষের দেখা পাওয়া। বড় বড় চোখ করে চেয়ে থাকা আর পায়ে শিকল না থাকলে যাকে সামনে পাবে তাকেই জাপটে ধরা, খামচি কিংবা কামড়ে দেওয়া। মুখের কথা কেউ বুঝতে না পারলেও এটাই সাইফুলের বর্তমান অবস্থা।
রহিমা বেগমের স্বামী বহর আলী প্রায় ২০ বছর হলো মারা গেছেন। টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার ধারিয়াল গ্রামে অভাবের সংসারে ১৯৮৮ সালের ২৯ মার্চ মাসে সাইফুল জন্মগ্রহন করে। মায়ের জবানীতে জানা যায়, জন্মের পর থেকে সাইফুল মানুষ দেখলেই চেয়ে থাকতো। ধীরে ধীরে সাইফুল হাঁটাচলা শেখার পর শৈশব কেটেছে অন্যরকম পরিবেশে। সাইফুল কথা ঠিকমতো বলতে পারতো না।

ওর বয়সী কিংবা অন্যমানুষ দেখলেই বড় বড় করে চেয়ে থাকতো, যা ছোটবেলায় এটা অসুস্থতার লক্ষণ সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। ৭ বছর বয়স থেকে মানুষের দিকে শুধু চেয়ে থাকা নয়, মানুষ দেখলে তাদের খামচি ও কামড় দেওয়ার চেষ্টা করতো। এসব কাজে থেকে সাইফুলকে ফেরানো চেষ্টা করানো হয়। একসময় এলাকাবাসী ওর আচরনে ভয় পেতে শুরু করে। এলাকাবাসী ও নিজেদের রক্ষার্থে বাধ্য হয়ে ৮ বছর বয়সে ১৯৯৫ সালের ওর পায়ে লোহার শিকল পড়িয়ে দেই। যা এখন পর্যন্ত চলছে। শিকল খুলে দিলেই বড় বড় চোখ করে মানুষের দিকে এগিয়ে যায়। ওর জীবন শিকলবান্দা জীবন,এই জীবনে ওর শান্তি নাই।
ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন ডাক্তার কবিরাজের পিছনে ঘুরে ঘুরে রহিমা বেগম ছেলে সাইফুলের চিকিৎসা করাতে পারেননি। ডাক্তার কবিরাজ রোগ ধরতে ব্যর্থ হওয়ায় পাবনা পাগলাগারদে পাঠানোর চিন্তা করেছিলেন। পাগলাগারদে কিভাবে এবং কে নিয়ে যাবে সেই সিন্ধান্তে পাগলাগারদে নেওয়া হয়নি।
সাইফুল ছাড়া সংসারে আরো দুটি ছেলে রহিজ ও বাচ্চু আছে। তারা সাইফুলের বড়। বিয়ে করে গাড়ী চালনায় যুক্ত দুই ভাই অল্পআয়ে সংসার চালাচ্ছে। ছেলে অসুস্থ ও ভূমিহীন থাকায় সাইফুলের মা রহিমা বেগম সরকারের দেওয়া বাড়ীতে আছেন। সরকার থেকে ছেলের নামে ২৫০০ এবং মায়ের নামে ১৮০০ টাকা ভাতা পান। সেটা দিয়ে তাদের সংসার চলে না। যে কারনে চিকিৎসা বাদ দিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে বেঁচে আছেন।
এ বেঁচে থাকার মানে কি সেটা সাইফুল জানে না? সাইফুল জানে ক্ষুধা লাগলে খাবার। সাইফুলকে শিকলে বান্দা অবস্থায় খাবার দেওয়া ও বিছানায় শোবার ব্যবস্থা আছে। গোছলের সময় শিকলে বান্দা অবস্থায় গোছল করানো হয়। সকাল বেলা দাঁত মাঝা কিংবা মুখ ধোয়া কখনও হয়না। মানুষ দেখলেই বড় বড় চোখ করে চেয়ে থাকা! মানুষের প্রতি তার কি রাগ সেটা জানা যায়নি, অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত পাগল সাইফুলতো বলতেই পারবেনা।
ধারিয়াল জামে মসজিদের সেক্রেটারী সুমন আল মামুন বলেন, সাইফুল একজন নিরীহ ও অভাবী অসুস্থ মানুষ। তবে সে মানুষ দেখলেই বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকে, খামচি ও কামড় দেয়। যে কারনে বাধ্য হয়ে ওর মা তাকে শিখলে বেঁধে রাখে। এলাকাবাসীর সাহায্য ও সহযোগিতায় ওরা মা ছেলে বেঁচে আছে।
ঘাটাইল পৌরসভার ৬নং বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. জালাল হোসেন বলেন, আমরা ছোট্রবেলা থেকেই দেখে আসছি।ও আমাদের সমবয়সী হবে। ছোট্রবেলা থেকে ওর মানসিক সমস্যা। কিন্তু দারিদ্রতার কারনে সঠিক সময়ে ওর ব্রেনের চিকিৎসা করানো হয়নি। অদ্ভুত রোগটা নিয়ে ধীরে ধীরে সাইফুল বড় হলে এটা এখন প্রকট আকার ধারন করে। ওকে ছেড়ে দিলেই মানুষকে কামড় দিতে চায়। যাকে সামনে পায় তাকে জাপটে ধরে। সুযোগ পেলে শরীরের কাপড় খুলে ঘুরে বেড়ায়। তাই এলাকাবাসী বাধ্য হয়ে এই অভাবী পরিবারের সন্তানকে শিকলে বেঁধে রাখতে বাধ্য করছেন। এছাড়া অন্য উপায় তাদের হাতে নাই।
এব্যাপারে ঘাটাইল উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান সরকার জানান, এ বিষয়ে তিনি জানেন না। তবে তিনি দ্রুত তথ্য নিয়ে কিভাবে সহায়তা করা যায়, সেই চেষ্টা করবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু সাঈদ বলেন, জনাব সাইফুল ইসলামকে সরকারের সেফটি নেট কার্যক্রমের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। তবে তারপরও তিনি যদি সরকারের কাছে কোন সুযোগসুবিধা প্রত্যাশা করে, তাহলে স্থানীয় প্রশাসন তাকে সহায়তা করবে।
এম.কন্ঠ/ ১৭ জুলাই /এম. টি
























