ঢাকা ০৩:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সর্বশেষ
বাসাইলে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত টাঙ্গাইলে দুস্থ ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে অনুদানের চেক বিতরণ টাঙ্গাইলে ইয়াবা মামলায় এক ব্যক্তির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কালিহাতীতে মহিলা দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত ” সবুজ পৃথিবী গড়ি “ টাঙ্গাইলে ৩ দিনব্যাপী সুইট ফেস্টিভালের সমাপ্ত ঘাটাইলে অন্ধত্বকে জয় করা খামারি গফুর এখন সমাজের আলোকবর্তিকা একটু বৃষ্টিতেই স্কুল মাঠে হাঁটুপানি, দুর্ভোগে শিক্ষার্থীরা কালিহাতীতে ফুটবল টুর্নামেন্ট ফাইনাল খেলায় চ্যাম্পিয়ন হিন্নাইপাড়া টাঙ্গাইলের চমচম বিদেশে রপ্তানির পদক্ষেপ নেওয়া হবে-প্রতিমন্ত্রী টুকু

” সবুজ পৃথিবী গড়ি “

মুহাম্মদ শাহীন আল মামুন
প্রকাশ: ১২:৫৩:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্বই হোক আগামীর অঙ্গীকার
“একটি গাছ একটি প্রাণ,
সবুজ পৃথিবী সবার অধিকার।”

পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসস্থান। এই পৃথিবীর মাটি, পানি, বায়ু, গাছপালা, নদী, পাহাড়, বন ও জীববৈচিত্র্য—সবকিছু মিলেই আমাদের জীবনব্যবস্থা। অথচ মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে আজ পৃথিবীর স্বাভাবিক ভারসাম্য হুমকির মুখে। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, বন উজাড়, নদী-খাল দখল ও দূষণ, প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার, শিল্পবর্জ্য, যানবাহনের ধোঁয়া এবং কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
তাই এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—কীভাবে আমরা একটি সবুজ, নির্মল ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি।
সবুজ পৃথিবী কেন প্রয়োজন?

সবুজ মানেই শুধু গাছপালা নয়; সবুজ মানে জীবনের নিরাপত্তা। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, বাতাস পরিশুদ্ধ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে, বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে।
একটি বড় গাছ একই সঙ্গে ছায়া, খাদ্য, আশ্রয় ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উপাদান হিসেবে কাজ করে। শহরের ব্যস্ত জীবনে গাছ মানুষের মানসিক প্রশান্তিও বাড়ায়। তাই একটি গাছ লাগানো শুধু একটি চারা রোপণ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার অঙ্গীকার। জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতা বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও খরা, কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ, আবার কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার প্রকোপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও অস্বাভাবিক আবহাওয়া আমাদের জীবন ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে জয় নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই হতে পারে মানুষের টিকে থাকার পথ।
গাছ লাগাই, গাছ বাঁচাই সবুজ পৃথিবী গড়ার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উদ্যোগ হলো বৃক্ষরোপণ। কিন্তু শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। গাছের পরিচর্যা করতে হবে, নিয়মিত পানি দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে হবে।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, বাড়ি, রাস্তার পাশে এবং খালি জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা যেতে পারে। স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশীয় প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

আমাদের স্লোগান হতে পারে—
“একজন মানুষ, একটি গাছ—
সবুজ নিরাপদ বসবাস ”
প্লাস্টিকমুক্ত হোক আমাদের জীবন
সবুজ পৃথিবীর অন্যতম বড় শত্রু হলো প্লাস্টিক দূষণ। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে যায় এবং মাটি, পানি ও জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই কাপড়ের ব্যাগ, কাগজের ব্যাগ কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যেখানে সম্ভব, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলতে হবে। পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা শুরু হতে পারে নিজের ঘর থেকেই। পরিচ্ছন্নতা হোক অভ্যাস
রাস্তা, বিদ্যালয়, বাজার, খেলার মাঠ কিংবা নদীর পাড়—কোথাও ময়লা ফেলা যাবে না। বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে এবং সম্ভব হলে জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা করতে হবে। খাদ্যের উচ্ছিষ্ট, শুকনো পাতা ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরি করা যায়। এতে একদিকে বর্জ্য কমে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা বাড়ে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ কোনো বিশেষ দিনের কর্মসূচি নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনচর্চা। শিক্ষার্থীরাই হতে পারে পরিবর্তনের দূত । একটি সবুজ পৃথিবী গড়তে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে তরুণ প্রজন্ম। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে এর প্রভাব পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়বে।

প্রতিটি বিদ্যালয়ে গড়ে উঠতে পারে—
* পরিবেশ ক্লাব
* বৃক্ষ পরিচর্যা দল
* পরিচ্ছন্নতা অভিযান
* প্লাস্টিকবিরোধী প্রচারণা
* ছাদবাগান
* সবুজ ক্যাম্পাস কর্মসূচি
* পাখি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রম
“এক শিক্ষার্থী এক গাছ” কর্মসূচি

শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ে পরিবেশ সম্পর্কে পড়বে না; তারা নিজেরাই পরিবেশ রক্ষার কাজে অংশ নেবে। তখন শিক্ষা হবে বাস্তবমুখী এবং জীবনঘনিষ্ঠ। প্রযুক্তির সঙ্গে পরিবেশের বন্ধুত্ব প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যেন পরিবেশের জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়, সৌরশক্তির ব্যবহার, গণপরিবহনকে উৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় কাগজের ব্যবহার কমানো এবং পুরোনো ইলেকট্রনিক সামগ্রী যথাযথভাবে পুনর্ব্যবহার—এসব ছোট ছোট উদ্যোগ পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা তৈরি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। শুধু গাছ নয়, জীববৈচিত্র্যও রক্ষা করতে হবে সবুজ পৃথিবী মানে শুধু মানুষের জন্য সুন্দর পৃথিবী নয়। পৃথিবী পাখি, মাছ, প্রজাপতি, মৌমাছি, প্রাণী ও অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবেরও আবাসস্থল।

একটি প্রাণী বা উদ্ভিদ হারিয়ে গেলে পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যায়। তাই বন, জলাভূমি, নদী ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করতে হবে। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা মানে আসলে মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। পরিবর্তন শুরু হোক নিজেকে দিয়ে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার, পরিবেশবিদ বা কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের নয়। প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব রয়েছে।

 

আমি যদি একটি গাছ লাগাই,
আপনি যদি একটি গাছ লাগান,
একটি পরিবার যদি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমায়,
একটি বিদ্যালয় যদি সবুজ ক্যাম্পাস গড়ে তোলে,
একটি সমাজ যদি পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নেয়—
তাহলে ছোট ছোট উদ্যোগ একদিন বড় পরিবর্তন তৈরি করবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে—
“পৃথিবী আমরা পূর্বপুরুষের কাছ থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে পাইনি; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।”
তাই তাদের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
আমাদের অঙ্গীকার
আসুন, আমরা সবাই আজ কিছু ছোট অঙ্গীকার করি—
– গাছ লাগাব, গাছ বাঁচাব।
– প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাব।
– যত্রতত্র ময়লা ফেলব না।
– পানি ও বিদ্যুৎ অপচয় করব না।
– প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করব।
অন্যকেও পরিবেশ রক্ষায় উৎসাহিত করব।
কারণ পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার জন্য সবসময় বড় কোনো কাজের প্রয়োজন হয় না। একজন মানুষের একটি ছোট ভালো কাজও পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

শেষ কথা
সবুজ পৃথিবী কোনো স্বপ্ন নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাস্তবায়নযোগ্য একটি লক্ষ্য। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও ধারাবাহিক উদ্যোগ।
আজ আমরা যে গাছটি লাগাব, তার ছায়ায় হয়তো একদিন আমাদের সন্তান বসবে। আজ আমরা যে নদীটি পরিষ্কার রাখব, সেখানে হয়তো আগামী প্রজন্মের শিশুরা নির্মল প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবে।
তাই আসুন, প্রকৃতিকে ভালোবাসি, পৃথিবীকে ভালোবাসি।
সবুজ হোক আমাদের ঘর,
সবুজ হোক আমাদের বিদ্যালয়,
সবুজ হোক আমাদের শহর ও গ্রাম,
সবুজ হোক বাংলাদেশ—
সবুজ হোক আমাদের পৃথিবী।
“সবুজ পৃথিবী গড়ি—
আগামীর প্রজন্মকে নিরাপদ জীবন উপহার দিই।”

 

লেখক- মুহাম্মদ শাহীন আল মামুন , সিনিয়র শিক্ষক ,বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, টাঙ্গাইল।
এম.কন্ঠ/ ০৯ সেপ্টেম্বর  /আর.কে
ট্যাগ :

নিউজটি শেয়ার করুন

” সবুজ পৃথিবী গড়ি “

প্রকাশ: ১২:৫৩:৫৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকৃতির সঙ্গে বন্ধুত্বই হোক আগামীর অঙ্গীকার
“একটি গাছ একটি প্রাণ,
সবুজ পৃথিবী সবার অধিকার।”

পৃথিবী আমাদের একমাত্র বাসস্থান। এই পৃথিবীর মাটি, পানি, বায়ু, গাছপালা, নদী, পাহাড়, বন ও জীববৈচিত্র্য—সবকিছু মিলেই আমাদের জীবনব্যবস্থা। অথচ মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে আজ পৃথিবীর স্বাভাবিক ভারসাম্য হুমকির মুখে। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, বন উজাড়, নদী-খাল দখল ও দূষণ, প্লাস্টিকের অতিরিক্ত ব্যবহার, শিল্পবর্জ্য, যানবাহনের ধোঁয়া এবং কার্বন নিঃসরণের ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে।
তাই এখন সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—কীভাবে আমরা একটি সবুজ, নির্মল ও বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে পারি।
সবুজ পৃথিবী কেন প্রয়োজন?

সবুজ মানেই শুধু গাছপালা নয়; সবুজ মানে জীবনের নিরাপত্তা। গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়, বাতাস পরিশুদ্ধ করে, মাটির ক্ষয় রোধ করে, বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিকতা বজায় রাখতে সাহায্য করে এবং অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে।
একটি বড় গাছ একই সঙ্গে ছায়া, খাদ্য, আশ্রয় ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উপাদান হিসেবে কাজ করে। শহরের ব্যস্ত জীবনে গাছ মানুষের মানসিক প্রশান্তিও বাড়ায়। তাই একটি গাছ লাগানো শুধু একটি চারা রোপণ নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার অঙ্গীকার। জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতা বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোথাও অতিবৃষ্টি, কোথাও খরা, কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ, আবার কোথাও ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার প্রকোপ বাড়ছে।

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড় ও অস্বাভাবিক আবহাওয়া আমাদের জীবন ও অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে।
এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতিকে জয় নয়, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানই হতে পারে মানুষের টিকে থাকার পথ।
গাছ লাগাই, গাছ বাঁচাই সবুজ পৃথিবী গড়ার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকর উদ্যোগ হলো বৃক্ষরোপণ। কিন্তু শুধু গাছ লাগালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। গাছের পরিচর্যা করতে হবে, নিয়মিত পানি দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে হবে।
প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অফিস, বাড়ি, রাস্তার পাশে এবং খালি জায়গায় পরিকল্পিতভাবে বৃক্ষরোপণ করা যেতে পারে। স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দেশীয় প্রজাতির গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

আমাদের স্লোগান হতে পারে—
“একজন মানুষ, একটি গাছ—
সবুজ নিরাপদ বসবাস ”
প্লাস্টিকমুক্ত হোক আমাদের জীবন
সবুজ পৃথিবীর অন্যতম বড় শত্রু হলো প্লাস্টিক দূষণ। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে যায় এবং মাটি, পানি ও জলজ প্রাণীর জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
তাই কাপড়ের ব্যাগ, কাগজের ব্যাগ কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। যেখানে সম্ভব, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলতে হবে। পরিবেশ রক্ষার শিক্ষা শুরু হতে পারে নিজের ঘর থেকেই। পরিচ্ছন্নতা হোক অভ্যাস
রাস্তা, বিদ্যালয়, বাজার, খেলার মাঠ কিংবা নদীর পাড়—কোথাও ময়লা ফেলা যাবে না। বর্জ্য নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে এবং সম্ভব হলে জৈব ও অজৈব বর্জ্য আলাদা করতে হবে। খাদ্যের উচ্ছিষ্ট, শুকনো পাতা ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরি করা যায়। এতে একদিকে বর্জ্য কমে, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা বাড়ে। পরিচ্ছন্ন পরিবেশ কোনো বিশেষ দিনের কর্মসূচি নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনচর্চা। শিক্ষার্থীরাই হতে পারে পরিবর্তনের দূত । একটি সবুজ পৃথিবী গড়তে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে তরুণ প্রজন্ম। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে এর প্রভাব পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়বে।

প্রতিটি বিদ্যালয়ে গড়ে উঠতে পারে—
* পরিবেশ ক্লাব
* বৃক্ষ পরিচর্যা দল
* পরিচ্ছন্নতা অভিযান
* প্লাস্টিকবিরোধী প্রচারণা
* ছাদবাগান
* সবুজ ক্যাম্পাস কর্মসূচি
* পাখি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রম
“এক শিক্ষার্থী এক গাছ” কর্মসূচি

শিক্ষার্থীরা শুধু বইয়ে পরিবেশ সম্পর্কে পড়বে না; তারা নিজেরাই পরিবেশ রক্ষার কাজে অংশ নেবে। তখন শিক্ষা হবে বাস্তবমুখী এবং জীবনঘনিষ্ঠ। প্রযুক্তির সঙ্গে পরিবেশের বন্ধুত্ব প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে। কিন্তু প্রযুক্তির ব্যবহার যেন পরিবেশের জন্য বোঝা না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়, সৌরশক্তির ব্যবহার, গণপরিবহনকে উৎসাহিত করা, অপ্রয়োজনীয় কাগজের ব্যবহার কমানো এবং পুরোনো ইলেকট্রনিক সামগ্রী যথাযথভাবে পুনর্ব্যবহার—এসব ছোট ছোট উদ্যোগ পরিবেশ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষার্থীরা পরিবেশবিষয়ক সচেতনতা তৈরি করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৃক্ষরোপণ, পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ সংরক্ষণের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। শুধু গাছ নয়, জীববৈচিত্র্যও রক্ষা করতে হবে সবুজ পৃথিবী মানে শুধু মানুষের জন্য সুন্দর পৃথিবী নয়। পৃথিবী পাখি, মাছ, প্রজাপতি, মৌমাছি, প্রাণী ও অসংখ্য ক্ষুদ্র জীবেরও আবাসস্থল।

একটি প্রাণী বা উদ্ভিদ হারিয়ে গেলে পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারিয়ে যায়। তাই বন, জলাভূমি, নদী ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংরক্ষণ করতে হবে। প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা মানে আসলে মানুষের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা। পরিবর্তন শুরু হোক নিজেকে দিয়ে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকার, পরিবেশবিদ বা কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের নয়। প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব রয়েছে।

 

আমি যদি একটি গাছ লাগাই,
আপনি যদি একটি গাছ লাগান,
একটি পরিবার যদি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমায়,
একটি বিদ্যালয় যদি সবুজ ক্যাম্পাস গড়ে তোলে,
একটি সমাজ যদি পরিচ্ছন্নতার দায়িত্ব নেয়—
তাহলে ছোট ছোট উদ্যোগ একদিন বড় পরিবর্তন তৈরি করবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে—
“পৃথিবী আমরা পূর্বপুরুষের কাছ থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে পাইনি; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছ থেকে ধার নিয়েছি।”
তাই তাদের জন্য একটি নিরাপদ, সুন্দর ও বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়া আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
আমাদের অঙ্গীকার
আসুন, আমরা সবাই আজ কিছু ছোট অঙ্গীকার করি—
– গাছ লাগাব, গাছ বাঁচাব।
– প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাব।
– যত্রতত্র ময়লা ফেলব না।
– পানি ও বিদ্যুৎ অপচয় করব না।
– প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করব।
অন্যকেও পরিবেশ রক্ষায় উৎসাহিত করব।
কারণ পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার জন্য সবসময় বড় কোনো কাজের প্রয়োজন হয় না। একজন মানুষের একটি ছোট ভালো কাজও পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।

শেষ কথা
সবুজ পৃথিবী কোনো স্বপ্ন নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাস্তবায়নযোগ্য একটি লক্ষ্য। প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও ধারাবাহিক উদ্যোগ।
আজ আমরা যে গাছটি লাগাব, তার ছায়ায় হয়তো একদিন আমাদের সন্তান বসবে। আজ আমরা যে নদীটি পরিষ্কার রাখব, সেখানে হয়তো আগামী প্রজন্মের শিশুরা নির্মল প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করবে।
তাই আসুন, প্রকৃতিকে ভালোবাসি, পৃথিবীকে ভালোবাসি।
সবুজ হোক আমাদের ঘর,
সবুজ হোক আমাদের বিদ্যালয়,
সবুজ হোক আমাদের শহর ও গ্রাম,
সবুজ হোক বাংলাদেশ—
সবুজ হোক আমাদের পৃথিবী।
“সবুজ পৃথিবী গড়ি—
আগামীর প্রজন্মকে নিরাপদ জীবন উপহার দিই।”

 

লেখক- মুহাম্মদ শাহীন আল মামুন , সিনিয়র শিক্ষক ,বিন্দুবাসিনী সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়, টাঙ্গাইল।
এম.কন্ঠ/ ০৯ সেপ্টেম্বর  /আর.কে