প্রতারক জাহাঙ্গীরের ফাঁদে পড়ে স্কুল শিক্ষিকা কাজল নিঃস্ব
২০১৯ সালে ঢাকায় প্রশিক্ষণের সুবাধে ইলেকট্রিশিয়ান মো. জাহাঙ্গীর আলমের সাথে পরিচয় হয় স্কুল শিক্ষিকা রেহেনা কাজলের। পরবর্তীতে তারা প্রেম করে বিয়ে করেন। কাজলের কাছ থেকে কৌশলে অন্তত ১০ লাখ টাকা, দুই ভরি স্বর্ণ ও অর্ধলাখ টাকা দামের মুঠোফোন হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে।
কাজল জানতে পারেন জাহাঙ্গীর ইতিপূর্বেও একাধিক মেয়ের সাথে এমন প্রতারণা করেছেন। এছাড়াও তার কর্মস্থলের একাধিক নারীর সাথে তিনি উত্যক্ত ও হেনেস্থা করেছেন। এসব বিষয়ে উর্ধতন কর্মকর্তা ও থানায় একাধিক অভিযোগ এবং মামলা করা হয়েছে।
মো. জাহাঙ্গীর আলম দিনাজপুরের জামালপুর গ্রামের মো. জহুরুলের ছেলে ও রেহেনা কাজল টাঙ্গাইলের গাড়াইল গ্রামের আব্দুর রশিদের মেয়ে। জাহাঙ্গীরের একাধিক জাতীয় পরিচয় পত্র, একাধিক বিয়ের কাবিননামা ও একাধিক অবৈধ সম্পর্ক এবং তার কর্মস্থলের বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও নারী কলিগদের উত্যক্ত হেনেস্থার তথ্য হাতে পেয়েছে যুগান্তর।
জানা যায়, মো. জাহাঙ্গীর আলম ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর ইলেকট্রিশিয়ান পদে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় এলজিইডিতে যোগদান করেন। পরবর্তীতের তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। ২০২০ সালের ১২ ডিসেম্বর গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এলজিইডির প্রকৌশলী মো. তাহাজ্জদ হোসেন অনিয়মিতভাবে অফিস ও বিভিন্ন কাজের জটিলতা সৃষ্টির অভিযোগে মো. জাহাঙ্গীর আলমকে কারণ দর্শানোর নোটিশ করেন।
২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর পলাশবাড়ীর এলজিইডি সার্ভেয়ার মোসা. রওশন আরা আখি উপজেলা এলজিইডি কর্মকর্তার কাছে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে উত্যক্ত করার অভিযোগ করেন। ২০২১ সালের ২৪ ডিসেম্বর পূনরায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেন। ২০২১ সালের ২০ ডিসেম্বর জান্নাতুল ফেরদৌস বাদি হয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। সেখানে জাহাঙ্গীরের বিয়েসহ নানা বিষয়ে অভিযোগ করা হয়। ২০২২ সালের ৭ আগস্ট মোছা. জান্নাতুল ফেরদৌস নামের এক স্কুল শিক্ষিকা বাদি হয়ে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট থানায় জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
সেখানে তিনি উল্লেখ করেন জাহাঙ্গীর তাকে না জানিয়ে আরেকটি বিয়ে করেছেন। এ বিষয়ে ঘোড়াঘাটের খোদাদাতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে জান্নাতুল ফেরদৌসকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। একাধিক বউ থাকা সত্¦েও ২০২২ সালের ১৭ জুলাই জাহাঙ্গীর কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সদস্য পদ লাভ করেন। ২০২৩ সালের ২১ মে স্কুল শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌস আগারগাঁও এর স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।
২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট স্কুল শিক্ষিকা মোছা. রেহেনা কাজল নামের অপর এক শিক্ষিকা ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। সেখানে জাহাঙ্গীরের একাধিক বিয়ে, বিভিন্ন অনৈতিক ও অপরাধমূলক কাজের বিষয়ে তুলে ধরেন। এছাড়াও নানা বিষয়ে ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর রেহেনা কাজল ঘোড়াঘাট থানায় লিখিত অভিযোগ দেন।
২০২৪ সালের ১৭ অক্টোবর ঢাকার মিরপুরের শাহআলী এলাকার এজাজুল নামের এক ব্যক্তি জাহাঙ্গীর আলমের জন্মসাল জালিয়াতিসহ নানা অভিযোগে প্রধান প্রকৌশলী বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। ২০২৪ সালের ১২ ডিসেম্বর জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ এনে রেহেনা কাজল নামের সাবেক স্ত্রী জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন।
স্কুল শিক্ষিকা রেহেনা কাজল বলেন, আমি আমার টাকা ও স্বর্ণ ফেরত চাই। এই প্রতারক যাতে আর কারো সাথে প্রতারণা করতে না পারেন সেই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজরদারি কামনা করি। এছাড়াও তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
নাটোরের স্কুল শিক্ষিকা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ২০১০ সালে জাহাঙ্গীরকে বিয়ে করি। বিয়ের পর থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সব বেতন তাকে দিতে হয়েছে। এছাড়াও লোন করে আরও ১২ লাখ টাকা দিয়েছি। সব মিলিয়ে আমাকে নিঃস্ব করে দিয়েছে জাহাঙ্গীর। বিয়ের বাইরেও জাহাঙ্গীরের অনেক নারীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক রয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৩ সালে আমার কণ্যা সন্তান জন্মের পর ২০১৪ সালের দিনাজপুর চলে চাই। পরে জানতে পারি তিনি আমার আগেও জয়পুর হাটের লাভলী নামের এক মেয়েকে বিয়ে করেছিলো। এছাড়াও তার বাসার কাছে এক ভ্যান চালকের স্ত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক ছিলো। বিষয়টি জানতে পেরে ভ্যান চালক আত্মহত্যা করেছে। ২০২১ সালে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট এলাকার এক চায়ের দোকানদারের মেয়ের সাথে সম্পর্ক করেছিলো। পরে তাকে বিয়ে না করায় মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে।
তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে মামলা করলে পরবর্তীতে আমার আইনজীবীরাও জাহাঙ্গীরের পক্ষে কথা বলেন। পরবর্তীতে মামলাটি আমি আর জোর দেয়নি।
অভিযুক্ত মো. জাহাঙ্গীর বলেন, আমি দুই বিয়ে করেছি। চার বিয়ে করিনি। আমার নামে যে অভিযোগ গুলো আনা হয়েছে, তা সবই মিথ্যা ও বানোয়াট। কাজল নিজেও তার কর্মস্থলে বিভিন্নজনের সাথে খারাপ আচরণ করেছে। এছাড়াও আমাদের বিরুদ্ধে কাগজ পত্র তৈরি করতে অনেক জায়গায় চুরি পর্যন্ত করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বদলি হওয়ায় তাদের বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।
এম.কন্ঠ/ ১৩ জুন /এম. টি






















