দর্শকের জোয়ার সৃষ্টি হলেও টাঙ্গাইলে ফুটবল লীগ বন্ধ প্রায় পাঁচ বছর
সমুদ্রের ঢেউ আচঁড়ে পড়ার মতো টাঙ্গাইল শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে দীর্ঘদিন পর ফুটবল প্রিয় দর্শকের ঢল নেমেছিলো। ফুটবল প্রিয় দর্শকের ফুটবলের প্রতি আবেগ আর ভালোবাসা দেখে মনে পড়ে যায় সেই নব্বই দশকের কথা। জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের আবাহনী, মোহামেডান, ব্রাদাস কিংবা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের খেলায় সেই সময়ের দর্শকের কথা। ২০ টাকা দামের টিকিট কেটে সাধারণ দর্শকের সেই ভীড় ছিলো সেই সময়ের স্বরণকালের সেরা। সারা মাঠের গ্যালারিতে তিল ধারণের জায়গা নাই। বাংলাদেশ জাতীয় দলের তারকা ফুটবলারদের খেলা দেখতে ঠেলাঠেলি আর ঠেলাঠেলি।
নব্বই দশকের স্মৃতি ফিরে আসলো ২০২৬ সালের জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টে। বিনা টিকিটের দর্শকরা এবার গ্যালারি ছাড়িয়ে খেলার মাঠের দাগ পর্যন্ত চলে এসেছে। গ্যালারির কাঁটাতারের বেড়াও তাদের মাঠে আসার পথে বাঁধা হতে পারেনি। সারা মাঠে দর্শক! অবস্থা এমন হয়েছে যে, ফুটবল মাঠের রেফারী, দু’দলের কোচ ও বদলি খেলোয়াড়দের ডাগআউটও দর্শকের দখলে। মাঠের গোলপোষ্ট, কর্ণার ফ্ল্যাগ কিংবা মাঠের লাইনের পাশে বসে আছে ফুটবল দর্শক।
২০ হাজার ধারণ ক্ষমতার মাঠে টাঙ্গাইল শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে ৩৫ হাজারের বেশী দর্শক। দর্শকের উচ্ছাস এবং সোরগোলে ফিফা রেফারী সায়মন রেফারী এই অবস্থায় খেলা পরিচালনা করতে বাধ্য হয়েছেন। পুরো টুর্নামেন্টে দর্শকের চাহিদা ছিলো বিদেশী নিগ্রো খেলোয়াড়দের বলের ওপর নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং এবং চমৎকার স্কিল দর্শকদের মুগ্ধ করার মতো ম্যাজিক আর জাতীয় দলের ফুটবলারদের আকর্ষনীয় পারফরমেন্স। দর্শকদের খুশী করার মতো ছিলো ফুটবলারদের পারফরমেন্স। ছিলো দু’দলেরই জয়ের আঙ্খাকা থেকে মাঠে ফাউল থেকে হাতাহাতি উত্তেজনা পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত জমজমাট দর্শকের ফুটবল ম্যাচে জয়ী দল টাঙ্গাইল সদর।
২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবলের জোয়ার শেষ হতে না হতেই জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ শুরু। টেলিভিশনের দর্শকরা সরাসরি মাঠে ফুটবল খেলা দেখতেই ফুটবল ম্যাচের চাহিদা তখন তুঙ্গে। দীর্ঘ ৪৫ বছরের পুরাতন ফুটবল টুর্নামেন্টের ঐহিত্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে উপজেলার ১২টি দল নিয়ে দশম বারের মতো জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শেষ হলো জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট। অথচ টুর্নামেন্টে দেশের ঐতিহ্যবাহী আবাহনী মোহামেডান ব্রাদার্স ইউনিয়নসহ বড় বড় ক্লাবের পদচারনায় টুর্নামেন্টের আকর্ষন বৃদ্ধি পেত, কিন্তু সেই ঐতিহ্যকে পিছনে এই টুর্নামেন্টে অংশগ্রহন করলো উপজেলার দলগুলো!
ক্রীড়ামোদী দর্শকের কাছে যা অবাক করার মতো ব্যাপার। তবু সাধারণ দর্শক “নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো’ মতো ফুটবলে নিগ্রো কিংবা বিদেশী খেলোয়াড় অংশগ্রহন করলেই হলো। খেলার মান যাচাইয়ের প্রয়োজন নাই, ফুটবলের জাম্বুরা লাথি দেখার জন্য দর্শকের জোয়ারের সৃষ্টি হয়। সেই চাহিদায় গোল্ডকাপ ফুটবল হলেও তৃনমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় খেলোয়াড় তৈরী সুতি কারখানা জেলা ফুটবল লীগগুলো বন্ধ প্রায় পাঁচ বছর!
মাঠে বয়সভিত্তিক বিভিন্ন ধরনের ফুটবল খেলা হয়। এই খেলায় ক্রীড়ামোদী দর্শকের পোষায় না। এইসব খেলায় খেলোয়াড় আর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে শেষ হয়। দর্শকের জন্য ফুটবল আয়োজন! সেরকম ফুটবল খেলা হয় না। জেলা প্রিমিয়ার ফুটবল লীগ কিংবা জেলা প্রথম বিভাগ ফুটবল লীগ হলে ক্রীড়মোদী দর্শকের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো হয়। কিন্তু ২০২১ সালের পর সেই ক্লাব ভিত্তিক ফুটবল লীগ হয় না। জেলা ক্রীড়া সংস্থার অধীনে ক্লাবের নিবন্ধন আছে, কিন্তু মাঠে খেলাধূলায় তাদের উপস্থিতি নাই। জেলা ক্রীড়া সংস্থাও এই ক্লাবগুলো নিয়ে ফুটবল লীগ আয়োজন করবে! সেই ব্যবস্থাও করতে পারেনা।
আওয়ামী সরকার পতনের পর প্রায় আড়াই বছর হতে চললো, কিন্তু জেলা স্টেডিয়ামে ফুটবল কিংবা ক্রিকেট লীগ হচ্ছে না। বিএনপি সরকার ৭মাস হলো ক্ষমতায়। এখনও তৃনমূল পর্যায়ে খেলোয়াড় তৈরীর জন্য ঘরোয়া লীগ শুরু হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ফুটবল লীগ কিংবা ক্রিকেট লীগে অংশগ্রহন করতে প্রতিটি ক্লাবের যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়। তা চালানোর সামর্থ তাদের নাই। কিভাবে লীগ চালানো যায়? কিভাবে ক্রীড়াঙ্গনের উন্নতি করা যায়? সে পথের আলোচনায় না গিয়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার পদপদবী কিংবা সদস্য পদ নিয়ে তারা ব্যস্ত।
টাঙ্গাইল ফুটবল একাডেমী কোচ রনজিৎ বলেন, ফুটবলারদের প্রশিক্ষণের পর ফুটবল লীগই তাদের পরীক্ষা। যে পরীক্ষা দিয়ে একজন ফুটবলার পরিনীত হয়। এই মুহুর্তে জেলার প্রিমিয়ারসহ বিভিন্ন লীগ আয়োজন খুবই প্রয়োজন।”

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের প্রাথমিক তালিকায় ডাক পেয়েছেন সদরের বিশ^নাথ ঘোষ, সৌরভ দেওয়ান, ভূয়াপুর উপজেলার রফিকুল ইসলাম ও মঞ্জুরুল রহমান মানিক। এসব তারকা খেলোয়াড়দের সাথে কথা বলে জানা যায়। তাদের প্রায় জনই ব্যক্তিগত চেষ্টায় বর্তমানে জাতীয় দলের প্রাথমিক ট্রায়ালে আছেন। ওদের কথা – ভবিষৎ খেলোয়াড় তৈরী জন্য নিয়মিত ফুটবল লীগ আয়োজন জরুরি। এ ব্যাপারে কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
জেলার উঠতি ফুটবলার রনি বলেন, ফুটবল লীগের আয়োজন খুবই প্রয়োজন। ফুটবল লীগ হলে আমরা আমাদের পারফরমেন্সের উন্নতির পাশাপাশি আর্থিক সহযোগিতা পাবো। ফুটবল লীগের প্রত্যাশায় আমরা তাকিয়ে আছি। ফুটবলার করিম বলেন, টুর্নামেন্টের পাশাপাশি জেলার ফুটবল লীগ যদি নিয়মিত তাহলে টাঙ্গাইল থেকে অনেক ভালোমানের ফুটবলার তৈরী হবে এবং ফুটবলারদের আর্থিক সঙ্গতিও তৈরী হবে।
জেলা ফুটবল এসোসিয়েশনের সদস্য সচিব ভ্রমর চন্দ্র ঘোষ বলেন, অচিরেই প্রিমিয়ার ফুটবল লীগ থেকে শুরু করে প্রথম বিভাগ এবং দ্বিতীয় বিভাগ ফুটবল লীগ হবে বলে জানান।
জেলা ফুটবল এসোসিয়েশনের সভাপতি আলী ইমাম তপন বলেন, “বিগত ১৭ বছরে হাতে গোনা ২টি থেকে ৩টি লীগ হয়েছে নামমাত্র। আমরা দ্রæত প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয়সহ বিভিন্ন লীগ আয়োজনে চেষ্টা করছি। এ বিষয়ে ২টি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। টাঙ্গাইলের ক্রীড়ামোদী দর্শকরা আগামী ২ মাসের মধ্যে ফুটবল লীগ দেখতে পারবেন আশা করি।”
পরিশেষে টাঙ্গাইলের সেরা ফুটবল টুর্নামেন্ট জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ ফুটবলের তথ্য দিয়ে সমাপ্তি টানছি। ১৯৮০ সালে সাবেক জেলা প্রশাসক মোঃ রেজাউল ইসলাম জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপ আয়োজন করে ফুটবলে নবজাগরণ সৃষ্টি করেন।
১৯৮০ সাল থেকে ১৯৯১ সাল টুর্নামেন্ট চলার মাঝে এক যুগ পর ২০০৪ এবং ২০১৫ সালে আবারো আয়োজন হয়। রোল অব অনার-জেলা প্রশাসক গোল্ডকাপঃ ১)১৯৮০ সালঃ আবাহনী, টাঙ্গাইল ও কালেক্টরেট, টাঙ্গাইল যুগ্ন চ্যাম্পিয়ন। ২) ১৯৮১ সালঃ আজাদ স্পোটিং ক্লাব চাম্পিয়ন, ঢাকা ফরাশগঞ্জ ক্লাব রানার্সআপ। ৩) ১৯৮২ সালঃ ডক ইয়ার্ড (নারায়ণগঞ্জ) চ্যাম্পিয়ন, রহমতগঞ্জ, ঢাকা রানার্সআপ। ৪) ১৯৮৩ সালঃ কাস্টমস এন্ড এক্সাইজ,ঢাকা, চ্যাম্পিয়ন, ঢাকা লালবাগ ক্রীড়া চক্র রানার্স আপ। ৫) ১৯৮৪ সালঃ কাস্টমস এন্ড এক্সাইজ,ঢাকা, চ্যাম্পিয়ন, ইস্ট এন্ড ক্লাব, টাঙ্গাইল রানার্স আপ। ৬) ১৯৮৯ সালঃ কাস্টমস এন্ড এক্সাইজ, ঢাকা, চ্যাম্পিয়ন, ঢাকা ব্রাদার্স ইউনিয়ন রানার্স আপ। ৭) ১৯৯১ সালঃ ঢাকা আবাহনী ও ব্রাদার্স ইউনিয়ন ক্লাব যুগ্ন চ্যাম্পিয়ন। ৮) ২০০৪ সালঃ ঢাকা মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদ- চ্যাম্পিয়ন, ঢাকা আবাহনী ক্রীড়া চক্র রানার্সআপ। ৯) ২০১৫ সালঃ টাঙ্গাইল ইয়ুথ ক্লাব- চ্যাম্পিয়ন, ঢাকা বিজেএমসি- রানার্সআপ। ১০) চ্যাম্পিয়ন- টাঙ্গাইল সদর উপজেলা ও রানার্সআপ- গোপালপুর উপজেলা।
এম.কন্ঠ/ ০২ সেপ্টেম্বর /এম. টি


















