ঢাকা ০৩:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃষ্ণার হাত ধরে গোপালপুরে জাতীয় শিরোপার গৌরব

মো. সেলিম হোসেন, গোপালপুর প্রতিনিধি :
প্রকাশ: ০৯:০১:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

একসময় গ্রামের মাঠে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে শুনতে হয়েছে নানা কথা। পরিবারের আপত্তি ও প্রতিবেশীদের কটূক্তিও থামাতে পারেনি তাঁকে। সেই মেয়েই আজ জাতীয় নারী ফুটবলের পরিচিত মুখ। তাঁর নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণায় টাঙ্গাইলের গোপালপুরের একটি ফুটবল একাডেমি পেয়েছে জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টের শিরোপা। তিনি জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় কৃষ্ণা রানী।

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) সাভারের বিরুলিয়ায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মাঠে অনুষ্ঠিত প্রথম আলো-স্টার নিউজ নারী ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে ময়মনসিংহের অদম্য কলসিন্দুর ফুটবল একাডেমিকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে টাঙ্গাইলের গোপালপুরের মরহুম ফরহাদ হোসেন তালুকদার ফুটবল একাডেমি। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কৃষ্ণা। তাঁর সঙ্গে জাতীয় নারী ফুটবল দলের একাধিক খেলোয়াড় থাকায় দলটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে।

টুর্নামেন্টের প্রথম তিন ম্যাচে কৃষ্ণা অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক সাবিনা খাতুন একাডেমির দলে যোগ দিলে তাঁকে অধিনায়ক করা হয়। ফাইনাল শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শিরোপা গ্রহণের সময় সাবিনা কৃষ্ণাকে সামনে এগিয়ে দেন। কৃষ্ণার কাছে মুহূর্তটি ছিল আনন্দ ও আবেগের।

কৃষ্ণা বলেন, “শুরুতে আমি অধিনায়ক ছিলাম। পরে সাবিনা আপু দলে যোগ দেওয়ায় তাঁকে অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি নিজেও তাঁকে সম্মান জানিয়ে ট্রফি গ্রহণ করতে বলেছিলাম। কিন্তু ট্রফি নেওয়ার সময় তিনি আমাকে সামনে এগিয়ে দেন। বিষয়টি আমার খুব ভালো লেগেছে। এটি আমার জন্য আনন্দের ও স্মরণীয় মুহূর্ত।”

ফাইনালের আগে কোয়ার্টার ফাইনালে আঘাত পেয়ে ব্যথা অনুভব করছিলেন কৃষ্ণা। তবু দলের প্রয়োজনে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন। ওষুধ খেয়ে খেলেছেন তিনটি ম্যাচ। বৃষ্টির কারণে ফাইনালের মাঠ কাদাময় হয়ে পড়েছিল। পায়ের চোট আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও দলের স্বার্থে সতর্ক থেকে খেলেছেন তিনি।

কৃষ্ণা বলেন, “কোয়ার্টার ফাইনালে আঘাত পাওয়ার পর পায়ে ব্যথা ছিল। তারপরও ফাইনাল খেলতে চেয়েছি। বৃষ্টির কারণে মাঠে কাদা ছিল, তাই পায়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়েছে। দলের ছোট-বড় সবাই অনেক সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে সাবিনা আপু, মাসুরা, নীলা ও সুমাইয়া পাশে ছিল। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।”

গ্রামের মাঠ থেকে জাতীয় দলে

কৃষ্ণার জন্ম ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথালিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা শ্রী বাসুদেব দেব কৃষিকাজ করেন। মা শ্রীমতী নমিতা রানী দেব গৃহিণী। দুই ভাইবোনের মধ্যে কৃষ্ণা ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে ফুটবলের প্রতি ছিল তাঁর আলাদা টান।

শৈশবে গ্রামের মাঠে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে পরিবারের আপত্তি ছিল। প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও শুনতে হয়েছে কটূক্তি। একপর্যায়ে পরিবারের আপত্তিতে অভিমান করে খাবার না খাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। তবে ফুটবলের প্রতি অদম্য আগ্রহ দেখে ধীরে ধীরে পরিবারের সদস্যরাও তাঁর পাশে দাঁড়ান। বাবা, ছোট চাচা নিতাই, চাচা গৌরসহ পরিবারের অন্য সদস্য ও ছোট ভাইয়ের সহযোগিতা তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। তবে মায়ের মনে এখনো মেয়ের চোট পাওয়ার আশঙ্কা কাজ করে।

২০১১ সালে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আন্তঃপ্রাথমিক ফুটবল টুর্নামেন্টের উপজেলা পর্যায়ের খেলায় উত্তর পাথালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে অংশ নিয়ে নিজের প্রতিভার জানান দেন কৃষ্ণা। তাঁর খেলা নজরে আসে গোপালপুর সূতি ভি.এম. পাইলট মডেল সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপনের। তাঁর সহযোগিতায় কৃষ্ণার ফুটবলচর্চার পথ আরও প্রসারিত হয়। পরবর্তী সময়ে ওই বিদ্যালয় জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ফুটবল প্রতিযোগিতায় টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

বয়সভিত্তিক ফুটবলে একের পর এক সাফল্য পান কৃষ্ণা। ২০১৫ সালে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ দল প্রথমবারের মতো এএফসি আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় শিরোপা জেতে। ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ দলের অধিনায়ক হিসেবে এএফসি বাছাইপর্বে আটটি গোল করেন তিনি। ২০১৭ সালে তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দল থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

এরপর জাতীয় নারী ফুটবল দলেও নিজের জায়গা করে নেন কৃষ্ণা। ২০২২ সালে নেপালের বিপক্ষে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জোড়া গোল করেন তিনি। তাঁর দুই গোলের ওপর ভর করে বাংলাদেশ ৩-১ ব্যবধানে নেপালকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে। ওই জয় দেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

একাডেমির সঙ্গে কৃষ্ণার দীর্ঘ সম্পর্ক

মরহুম ফরহাদ হোসেন তালুকদার ফুটবল একাডেমির সঙ্গে কৃষ্ণার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। জাতীয় পর্যায়ে খেললেও গোপালপুরের মেয়েদের ফুটবল এগিয়ে নেওয়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ রয়েছে। প্রায় ১০ বছর জাতীয় পর্যায়ের বাইরে একাডেমির হয়ে খেলার সুযোগ না পেলেও এবার সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন তিনি। এর আগে জেলা বা আন্তবিদ্যালয় পর্যায়ে টাঙ্গাইল ও গোপালপুরের হয়ে খেলেছেন।

একাডেমির শরীরচর্চা শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, কৃষ্ণা শুধু মাঠে খেলেই দলের শক্তি বাড়াননি; তাঁর অভিজ্ঞতা ও উৎসাহ সতীর্থদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই দলে খেলার সুযোগ পেয়ে একাডেমির অন্য খেলোয়াড়েরাও আত্মবিশ্বাস পেয়েছেন।

একাডেমির প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গোলাম রায়হান বাপন বলেন, “মরহুম ফরহাদ হোসেন তালুকদার ছিলেন ক্রীড়ানুরাগী মানুষ। ফুটবল খেলোয়াড় ও প্রশিক্ষক তৈরিতে তাঁর অবদান স্মরণীয় করে রাখতে ২০০৬ সালে তাঁর নামে এই একাডেমির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এখানে ৪০ জন মেয়ে ও ২০০ জনের বেশি ছেলে ফুটবল প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। প্রথম আলো-স্টার নিউজ নারী ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে কৃষ্ণার অবদান অনেক। সে নিজে ভালো খেলার পাশাপাশি দলের অন্য খেলোয়াড়দেরও অনুপ্রাণিত করেছে।”

গ্রামের মেয়েদের ফুটবলে আনতে চান কৃষ্ণা

জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পেলেও কৃষ্ণার ভাবনায় রয়েছে গোপালপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েরা। তাঁর মতে, প্রতিভা থাকলেও শুধু আর্থিক ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মেয়ের ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্ন থেমে যায়। বিশেষ করে নিয়মিত অনুশীলনের জন্য বাড়ি থেকে গোপালপুরে আসা-যাওয়ার খরচ অনেক পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন। কয়েক দিন অনুশীলনে আসার পর যাতায়াত ব্যয়ের কারণে অনেকেই আর নিয়মিত থাকতে পারে না।

কৃষ্ণা বলেন, “গ্রামের অনেক মেয়ের ফুটবল খেলার আগ্রহ আছে। কিন্তু অনুশীলনে আসা-যাওয়ার ভাড়া জোগাড় করাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ চার-পাঁচ দিন অনুশীলনে এসে পরে আর আসতে পারে না। আমি যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করছি। বাপন স্যারও সহযোগিতা করছেন। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন খুব জরুরি। কষ্ট হলেও নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না। যাদের ফুটবল খেলার ইচ্ছা আছে, তারা খেলতে আসুক। যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করব।”

নিজের জীবনের শুরুর দিনগুলোর বাধার কথা মনে করে কৃষ্ণা মনে করেন, পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা পেলে গ্রামের মেয়েরাও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। তাঁর প্রত্যাশা, গোপালপুরের একাডেমি থেকে আরও বেশি নারী ফুটবলার উঠে আসবে এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করবে।

একসময় যে মেয়ের ফুটবল খেলা নিয়ে আপত্তি ছিল, আজ তাঁর সাফল্যে গর্বিত পরিবার ও এলাকাবাসী। জাতীয় দলের জার্সিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি নিজ এলাকার একাডেমিকে জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টে শিরোপা এনে দিয়েছেন কৃষ্ণা। তাঁর এই সাফল্য গোপালপুরের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে।

 

এম.কন্ঠ/ ০৩ নভেম্বর ২০২৬/এম. টি

নিউজটি শেয়ার করুন

কৃষ্ণার হাত ধরে গোপালপুরে জাতীয় শিরোপার গৌরব

প্রকাশ: ০৯:০১:১২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

একসময় গ্রামের মাঠে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে শুনতে হয়েছে নানা কথা। পরিবারের আপত্তি ও প্রতিবেশীদের কটূক্তিও থামাতে পারেনি তাঁকে। সেই মেয়েই আজ জাতীয় নারী ফুটবলের পরিচিত মুখ। তাঁর নেতৃত্ব, অভিজ্ঞতা ও অনুপ্রেরণায় টাঙ্গাইলের গোপালপুরের একটি ফুটবল একাডেমি পেয়েছে জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টের শিরোপা। তিনি জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় কৃষ্ণা রানী।

গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) সাভারের বিরুলিয়ায় ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি মাঠে অনুষ্ঠিত প্রথম আলো-স্টার নিউজ নারী ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালে ময়মনসিংহের অদম্য কলসিন্দুর ফুটবল একাডেমিকে ২-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে টাঙ্গাইলের গোপালপুরের মরহুম ফরহাদ হোসেন তালুকদার ফুটবল একাডেমি। টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন কৃষ্ণা। তাঁর সঙ্গে জাতীয় নারী ফুটবল দলের একাধিক খেলোয়াড় থাকায় দলটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে।

টুর্নামেন্টের প্রথম তিন ম্যাচে কৃষ্ণা অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। পরে বাংলাদেশ জাতীয় নারী ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক সাবিনা খাতুন একাডেমির দলে যোগ দিলে তাঁকে অধিনায়ক করা হয়। ফাইনাল শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শিরোপা গ্রহণের সময় সাবিনা কৃষ্ণাকে সামনে এগিয়ে দেন। কৃষ্ণার কাছে মুহূর্তটি ছিল আনন্দ ও আবেগের।

কৃষ্ণা বলেন, “শুরুতে আমি অধিনায়ক ছিলাম। পরে সাবিনা আপু দলে যোগ দেওয়ায় তাঁকে অধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আমি নিজেও তাঁকে সম্মান জানিয়ে ট্রফি গ্রহণ করতে বলেছিলাম। কিন্তু ট্রফি নেওয়ার সময় তিনি আমাকে সামনে এগিয়ে দেন। বিষয়টি আমার খুব ভালো লেগেছে। এটি আমার জন্য আনন্দের ও স্মরণীয় মুহূর্ত।”

ফাইনালের আগে কোয়ার্টার ফাইনালে আঘাত পেয়ে ব্যথা অনুভব করছিলেন কৃষ্ণা। তবু দলের প্রয়োজনে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন। ওষুধ খেয়ে খেলেছেন তিনটি ম্যাচ। বৃষ্টির কারণে ফাইনালের মাঠ কাদাময় হয়ে পড়েছিল। পায়ের চোট আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও দলের স্বার্থে সতর্ক থেকে খেলেছেন তিনি।

কৃষ্ণা বলেন, “কোয়ার্টার ফাইনালে আঘাত পাওয়ার পর পায়ে ব্যথা ছিল। তারপরও ফাইনাল খেলতে চেয়েছি। বৃষ্টির কারণে মাঠে কাদা ছিল, তাই পায়ের দিকে খেয়াল রাখতে হয়েছে। দলের ছোট-বড় সবাই অনেক সহযোগিতা করেছে। বিশেষ করে সাবিনা আপু, মাসুরা, নীলা ও সুমাইয়া পাশে ছিল। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি।”

গ্রামের মাঠ থেকে জাতীয় দলে

কৃষ্ণার জন্ম ২০০১ সালের ১ জানুয়ারি গোপালপুর উপজেলার উত্তর পাথালিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা শ্রী বাসুদেব দেব কৃষিকাজ করেন। মা শ্রীমতী নমিতা রানী দেব গৃহিণী। দুই ভাইবোনের মধ্যে কৃষ্ণা ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি আগ্রহী ছিলেন। বিশেষ করে ফুটবলের প্রতি ছিল তাঁর আলাদা টান।

শৈশবে গ্রামের মাঠে ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। মেয়েদের ফুটবল খেলা নিয়ে পরিবারের আপত্তি ছিল। প্রতিবেশীদের কাছ থেকেও শুনতে হয়েছে কটূক্তি। একপর্যায়ে পরিবারের আপত্তিতে অভিমান করে খাবার না খাওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। তবে ফুটবলের প্রতি অদম্য আগ্রহ দেখে ধীরে ধীরে পরিবারের সদস্যরাও তাঁর পাশে দাঁড়ান। বাবা, ছোট চাচা নিতাই, চাচা গৌরসহ পরিবারের অন্য সদস্য ও ছোট ভাইয়ের সহযোগিতা তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে। তবে মায়ের মনে এখনো মেয়ের চোট পাওয়ার আশঙ্কা কাজ করে।

২০১১ সালে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব আন্তঃপ্রাথমিক ফুটবল টুর্নামেন্টের উপজেলা পর্যায়ের খেলায় উত্তর পাথালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে অংশ নিয়ে নিজের প্রতিভার জানান দেন কৃষ্ণা। তাঁর খেলা নজরে আসে গোপালপুর সূতি ভি.এম. পাইলট মডেল সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শরীরচর্চা শিক্ষক গোলাম রায়হান বাপনের। তাঁর সহযোগিতায় কৃষ্ণার ফুটবলচর্চার পথ আরও প্রসারিত হয়। পরবর্তী সময়ে ওই বিদ্যালয় জাতীয় স্কুল ও মাদ্রাসা ফুটবল প্রতিযোগিতায় টানা তিনবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

বয়সভিত্তিক ফুটবলে একের পর এক সাফল্য পান কৃষ্ণা। ২০১৫ সালে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৪ দল প্রথমবারের মতো এএফসি আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় শিরোপা জেতে। ২০১৬ সালে অনূর্ধ্ব-১৬ দলের অধিনায়ক হিসেবে এএফসি বাছাইপর্বে আটটি গোল করেন তিনি। ২০১৭ সালে তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৬ দল থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

এরপর জাতীয় নারী ফুটবল দলেও নিজের জায়গা করে নেন কৃষ্ণা। ২০২২ সালে নেপালের বিপক্ষে সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জোড়া গোল করেন তিনি। তাঁর দুই গোলের ওপর ভর করে বাংলাদেশ ৩-১ ব্যবধানে নেপালকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জেতে। ওই জয় দেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।

একাডেমির সঙ্গে কৃষ্ণার দীর্ঘ সম্পর্ক

মরহুম ফরহাদ হোসেন তালুকদার ফুটবল একাডেমির সঙ্গে কৃষ্ণার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। জাতীয় পর্যায়ে খেললেও গোপালপুরের মেয়েদের ফুটবল এগিয়ে নেওয়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ রয়েছে। প্রায় ১০ বছর জাতীয় পর্যায়ের বাইরে একাডেমির হয়ে খেলার সুযোগ না পেলেও এবার সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েছেন তিনি। এর আগে জেলা বা আন্তবিদ্যালয় পর্যায়ে টাঙ্গাইল ও গোপালপুরের হয়ে খেলেছেন।

একাডেমির শরীরচর্চা শিক্ষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, কৃষ্ণা শুধু মাঠে খেলেই দলের শক্তি বাড়াননি; তাঁর অভিজ্ঞতা ও উৎসাহ সতীর্থদেরও অনুপ্রাণিত করেছে। জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সঙ্গে একই দলে খেলার সুযোগ পেয়ে একাডেমির অন্য খেলোয়াড়েরাও আত্মবিশ্বাস পেয়েছেন।

একাডেমির প্রতিষ্ঠার বিষয়ে গোলাম রায়হান বাপন বলেন, “মরহুম ফরহাদ হোসেন তালুকদার ছিলেন ক্রীড়ানুরাগী মানুষ। ফুটবল খেলোয়াড় ও প্রশিক্ষক তৈরিতে তাঁর অবদান স্মরণীয় করে রাখতে ২০০৬ সালে তাঁর নামে এই একাডেমির যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে এখানে ৪০ জন মেয়ে ও ২০০ জনের বেশি ছেলে ফুটবল প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। প্রথম আলো-স্টার নিউজ নারী ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে কৃষ্ণার অবদান অনেক। সে নিজে ভালো খেলার পাশাপাশি দলের অন্য খেলোয়াড়দেরও অনুপ্রাণিত করেছে।”

গ্রামের মেয়েদের ফুটবলে আনতে চান কৃষ্ণা

জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পেলেও কৃষ্ণার ভাবনায় রয়েছে গোপালপুরের প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়েরা। তাঁর মতে, প্রতিভা থাকলেও শুধু আর্থিক ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক মেয়ের ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্ন থেমে যায়। বিশেষ করে নিয়মিত অনুশীলনের জন্য বাড়ি থেকে গোপালপুরে আসা-যাওয়ার খরচ অনেক পরিবারের পক্ষে বহন করা কঠিন। কয়েক দিন অনুশীলনে আসার পর যাতায়াত ব্যয়ের কারণে অনেকেই আর নিয়মিত থাকতে পারে না।

কৃষ্ণা বলেন, “গ্রামের অনেক মেয়ের ফুটবল খেলার আগ্রহ আছে। কিন্তু অনুশীলনে আসা-যাওয়ার ভাড়া জোগাড় করাই তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। কেউ চার-পাঁচ দিন অনুশীলনে এসে পরে আর আসতে পারে না। আমি যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করছি। বাপন স্যারও সহযোগিতা করছেন। তবে এ ক্ষেত্রে পরিবারের সমর্থন খুব জরুরি। কষ্ট হলেও নিয়মিত অনুশীলন করতে হবে। পরিশ্রম কখনো বিফলে যায় না। যাদের ফুটবল খেলার ইচ্ছা আছে, তারা খেলতে আসুক। যতটুকু সম্ভব সহযোগিতা করব।”

নিজের জীবনের শুরুর দিনগুলোর বাধার কথা মনে করে কৃষ্ণা মনে করেন, পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা পেলে গ্রামের মেয়েরাও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। তাঁর প্রত্যাশা, গোপালপুরের একাডেমি থেকে আরও বেশি নারী ফুটবলার উঠে আসবে এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করবে।

একসময় যে মেয়ের ফুটবল খেলা নিয়ে আপত্তি ছিল, আজ তাঁর সাফল্যে গর্বিত পরিবার ও এলাকাবাসী। জাতীয় দলের জার্সিতে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পাশাপাশি নিজ এলাকার একাডেমিকে জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টে শিরোপা এনে দিয়েছেন কৃষ্ণা। তাঁর এই সাফল্য গোপালপুরের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে।

 

এম.কন্ঠ/ ০৩ নভেম্বর ২০২৬/এম. টি